
নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যে শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করার কথা, সেখানে যদি দুর্বলতা দেখা দেয়, তবে পুরো জাতিই ভবিষ্যতে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দলীয়করণ, কোটা ভিত্তিক নিয়োগ, এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের মতো অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছে।
শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানই করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং মানবিক গুণাবলী গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু যখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব, অর্থ বা রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়, তখন সেই পেশার মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক অদক্ষ ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যান, যাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, দায়বদ্ধতা কিংবা শিক্ষাদানের প্রতি আন্তরিকতা থাকে না।
ফলে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানে মনোযোগ না দিয়ে সময় কাটান গল্প, আড্ডা কিংবা চা পানের মধ্যে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও কমে যায়। শিক্ষার্থীরা যখন বিদ্যালয়ে এসে সঠিক শিক্ষা পায় না, তখন তারা অন্যদিকে ঝুঁকে পড়ে, যা ভবিষ্যতে তাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এদিকে অভিভাবকরাও ক্রমশ সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। তারা মনে করেন, তাদের সন্তানরা এখানে মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না। ফলে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিদ্যালয়ের দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও তারা সন্তানের ভালো শিক্ষার নিশ্চয়তা খুঁজছেন। এতে সমাজে একটি বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলোর সন্তানরা পিছিয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকার প্রতি মাসে এই শিক্ষকদের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে এই বেতন প্রদান করা হচ্ছে, কিন্তু তার বিপরীতে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল ব্যয়ের সঠিক প্রতিফলন কি আমরা পাচ্ছি?
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সঠিক পদক্ষেপ। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং মেধাভিত্তিক করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক লেনদেন যেন এখানে প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগের পর শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যারা দায়িত্বে অবহেলা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে যারা ভালো কাজ করছেন, তাদের উৎসাহিত করতে হবে।
পরিশেষে বলতে হয়, একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অপরিহার্য। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সময়ের দাবি। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্ম একটি সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।আসুন দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেই।