
নিজস্ব প্রতিবেদক
মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ—এটি শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি একটি সুন্দর, নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারছি?
মাদকবিরোধী সভা-সমাবেশে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনেকেই বড় বড় বক্তব্য দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদকবিরোধী নানা স্ট্যাটাস দেন, পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়, মানববন্ধন হয়। বলা হয়—মাদককে না বলুন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ুন, তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করুন। কথাগুলো নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা যদি হয় ভিন্ন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—শুধু বক্তব্য আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাস দিয়ে কি মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব?
সবচেয়ে বড় সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন মাদকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা কোনো ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধেই আবার মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কেউ যদি নিজের স্বার্থে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করেন, তাদের প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করেন কিংবা অপরাধীদের সামাজিকভাবে শক্তিশালী হতে সুযোগ দেন, তাহলে মঞ্চের বক্তব্য আর বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—কাউকে প্রমাণ ছাড়া ‘গডফাদার’, ‘শেল্টারদাতা’ বা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে আখ্যায়িত করা উচিত নয়। অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে। কারণ একজন নিরপরাধ মানুষের সম্মান নষ্ট করাও অন্যায়। একইভাবে কোনো অপরাধী যদি প্রভাবশালী হয়, তাহলে তার পরিচয় বা ক্ষমতার কারণে যেন আইনের হাত থেকে রেহাই না পায়—এটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না; এটি ধীরে ধীরে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মাদকের কারণে তরুণরা শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, কর্মক্ষমতা হারায়, অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। মাদকের সঙ্গে যখন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও অন্যান্য অপরাধ যুক্ত হয়, তখন পুরো সমাজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
তাই মাদকবিরোধী আন্দোলনকে শুধু বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে, কারা বিক্রি করছে এবং অর্থের প্রবাহ কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি যারা মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা বা আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনো প্রভাব থাকা উচিত নয়। মাদকের বিরুদ্ধে আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। কারণ অপরাধী যদি পরিচয়ের কারণে সুবিধা পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়। আর আইনের প্রতি আস্থা কমে গেলে অপরাধ আরও বাড়তে পারে।
শুধু প্রশাসন নয়, পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—অভিভাবকদের সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা গেলে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখা অনেক সহজ হবে।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, তথ্য ও প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটিকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের সামনে মাদক ব্যবসার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকবিরোধী আন্দোলন কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়; এটি একটি প্রজন্মকে রক্ষা করার আন্দোলন। এখানে লোক দেখানো কর্মকাণ্ডের চেয়ে প্রয়োজন সততা, সাহস ও নিরপেক্ষতা।
তাই প্রশ্নটা আজ সবার কাছে—মঞ্চে আমরা যতই বড় বড় বক্তব্য দিই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যত স্ট্যাটাসই দিই, বাস্তবে যদি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিই, তাহলে মাদকমুক্ত সমাজ কীভাবে তৈরি হবে?
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে আগে আমাদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলব, আবার মাদক ব্যবসায়ীর অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব—এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করতে হবে।
আসুন, শুধু বক্তব্য নয়—কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করি আমরা মাদকমুক্ত সমাজ চাই। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের মাপকাঠি। আইন হবে সবার জন্য সমান। পরিবার, সমাজ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে অবশ্যই একটি নিরাপদ সমাজ গড়া সম্ভব।
কারণ মাদকমুক্ত সমাজ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আর আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই পারে আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।আসুন সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে মাদক মুক্ত সমাজ গড়ি।