প্রবাসী বাংলাদেশি ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ – আল আমিন মিলু

রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

নিজস্ব প্রতিবেদক 

প্রবাস মানে শুধু বিদেশের মাটিতে বসবাস নয়; প্রবাস মানে শেকড় থেকে দূরে থাকা, প্রিয়জনের মুখ দেখার আকুতি বুকে নিয়ে হাজারো রাত পার করা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের ঘাম, শ্রম, সময় আর জীবনের সোনালি দিনগুলো অন্য একটি দেশের মাটিতে বিলিয়ে দেওয়া। প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, অসংখ্য পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। তাঁদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালোবাসা।

কিন্তু আজ প্রবাসী ভাইদের কাছে আমার একটি আন্তরিক অনুরোধ—আপনারা যাঁরা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে কাজের পরিবেশ, ভাষা, নিয়মকানুন ও জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন, আপনারা কি একটু ভেবে দেখবেন, আপনাদের পরিচিত কোনো যোগ্য মানুষকে বৈধ পথে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যায় কি না?

আপনারা হয়তো জানেন, একটি মানুষ যখন প্রথম বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর সামনে কত প্রশ্ন, কত ভয়, কত অনিশ্চয়তা এসে দাঁড়ায়। কোন দেশে যাবেন, কী কাজ করবেন, কোথায় থাকবেন, কত টাকা লাগবে, কোন এজেন্সি বিশ্বাসযোগ্য—এসব বুঝতে না পেরে অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়েন, জমিজমা বিক্রি করেন, ঋণের বোঝা কাঁধে নেন, এমনকি সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরেন।

অথচ সেই একই পথে আগে যাওয়া একজন অভিজ্ঞ প্রবাসী যদি তাঁকে সঠিক তথ্য দেন, বৈধ নিয়োগকর্তার সন্ধান দেন, কাজের বাস্তবতা বুঝিয়ে দেন এবং প্রতারণা থেকে সতর্ক করেন, তাহলে একজন মানুষের বিদেশযাত্রা অনেক বেশি নিরাপদ হতে পারে। আপনার সামান্য সহযোগিতা হয়তো একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারে।

একবার ভাবুন, আপনার পরিচিত একজন বেকার যুবক যদি আপনার সহযোগিতায় বৈধভাবে বিদেশে কাজ পান, তাহলে শুধু তাঁর জীবনই বদলাবে না; বদলে যেতে পারে তাঁর বাবা-মায়ের চিকিৎসা, ভাইবোনের পড়াশোনা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থাও।

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত মানসিকতা কাজ করে। কেউ বিদেশে গিয়ে ভালো আয় করতে শুরু করলে অনেক সময় নিজের অবস্থান ধরে রাখার চিন্তায় অন্য কাউকে সহযোগিতা করতে চান না। কেউ কেউ মনে করেন, পরিচিত মানুষ বিদেশে চলে এলে নিজের কাজের সুযোগ কমে যাবে, আয় কমবে, কিংবা নিজের গুরুত্ব হ্রাস পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একই কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, তবে প্রত্যেক মানুষের দক্ষতা, কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগ এক নয়। একজনের অগ্রগতি মানেই অন্যজনের পতন নয়।

বরং একজন অভিজ্ঞ প্রবাসী যখন আরেকজনকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন, তখন তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও মানবিক মূল্য আরও বাড়তে পারে। কারণ অর্থ দিয়ে মানুষ সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য কিনতে পারে, কিন্তু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়ে যে ভালোবাসা ও সম্মান অর্জন করা যায়, তার মূল্য অনেক গভীর।

তবে আমার এই অনুরোধের অর্থ এই নয় যে, সবাইকে অন্ধভাবে বিদেশে পাঠাতে হবে কিংবা কাউকে চাকরির মিথ্যা নিশ্চয়তা দিতে হবে। সহযোগিতা মানে শুধু বিদেশে নিয়ে যাওয়া নয়; সহযোগিতা মানে সঠিক তথ্য দেওয়া, বৈধ পথ দেখানো এবং বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। নিয়োগকর্তার অনুমোদন, কাজের চুক্তি, বেতন, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, ভিসার ধরন ও অন্যান্য শর্ত যাচাই না করে কাউকে অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। কাউকে নিজের সামর্থ্যের বাইরে ঋণ নিতে বলাও উচিত নয়।

প্রবাসী ভাইদের প্রতি আমার আরও একটি অনুরোধ—আপনারা নিজেদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত বেকার তরুণদের মধ্যে যাঁরা দক্ষ, পরিশ্রমী ও বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী, তাঁদের সঙ্গে আপনাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিন। সম্ভব হলে বিশ্বস্ত নিয়োগকর্তা বা বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়ার তথ্য দিন। নিজের কর্মস্থলে নিয়োগের সুযোগ থাকলে নিয়ম মেনে তাঁদের আবেদন করতে সাহায্য করুন। আর সুযোগ না থাকলে অন্তত কোন পথে এগোলে প্রতারণার ঝুঁকি কমবে, তা বুঝিয়ে দিন।

আমরা যদি প্রত্যেকে একজন মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাহলে হাজার হাজার পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারে। প্রবাসীদের পারস্পরিক সহযোগিতায় তৈরি হতে পারে একটি শক্তিশালী মানবিক নেটওয়ার্ক, যেখানে অভিজ্ঞরা নতুনদের পথ দেখাবেন, দক্ষরা অদক্ষদের শেখাবেন এবং প্রতিষ্ঠিতরা অসহায়দের সাহস জোগাবেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসে থাকা মানুষটি শুধু নিজের জন্য উপার্জন করেন না; তাঁর উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের অর্থনীতি, গ্রামের বাজার, পরিবারের চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না; এই অর্জনকে আরও মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তিতে পরিণত করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, আপনার আয় কিংবা সম্মান ভাগ করে দিতে হবে না; ভাগ করে দিতে হবে অভিজ্ঞতা, তথ্য ও সুযোগের সন্ধান। আপনার সহযোগিতায় অন্য কেউ প্রতিষ্ঠিত হলে আপনার অর্জন ছোট হয়ে যাবে না। বরং আপনার সাফল্য তখন আর একার থাকবে না—তা হয়ে উঠবে আরও একটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প।

আসুন, আমরা হিংসা নয়, সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলি। নিজের ভালো থাকার পাশাপাশি অন্যের ভালো থাকার পথটুকুও সহজ করি। প্রবাসের কঠিন জীবন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের বেকার মানুষের পাশে দাঁড়াই।

প্রবাসী ভাই, আপনার হাত ধরে যদি একজন মানুষের ভাগ্য বদলায়, আপনার সহযোগিতায় যদি একটি পরিবার দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে সেটিও হবে দেশের জন্য এক অনন্য অবদান।

আপনি বিদেশে ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন, সম্মানের সঙ্গে বাঁচুন। আর আপনার সেই ভালো থাকার গল্পে সম্ভব হলে আরও একজন বাংলাদেশির বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করুন।

কারণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধনী হওয়া জরুরি নয়; জরুরি একটি উদার মন। আর নিজের সাফল্যের আলো দিয়ে অন্যের পথ আলোকিত করতে পারাটাই মানুষের প্রকৃত বড়ত্ব।

আসুন, প্রবাসের সাফল্য হোক শুধু ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির নয়, অন্যের জীবন বদলে দেওয়ারও গল্প।

— আল আমিন মিলু
লেখক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক | গবেষক