তোমারে হারাইলাম কই – আল আমিন মিলু

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শেয়ার করুন:

কবিতা 

গেরামের মানুষ কয়,
আমি নাকি তোমারে হারাইছি!
আমি হাসি,
বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়া ওঠে—
হারাইতে হইলে তো আগে পাইতে অয়, আমি তো তোমারে পাইলামই না।

তুমি তো আমার ঘরের মানুষ আছিলা না, আছিলা বুকের ভিতর লুকাইয়া রাখা একখান গোপন গেরাম,
যেই গেরামের ঠিকানা কেউ জানে না, শুধু আমার মন জানে—
কত রাইতে সেই গেরামের পথে পথে তোমারে খুঁজতে গিয়া নিজেরেই হারাইছি!

তুমি আছিলা আকাশের ওই দূরের তারা, যারে ছুঁইবার সাধ আছে, সাধ্য নাই;
ছিলা নদীর ওপারের কাশবন,
চোখে পড়ে, মন টানে, কিন্তু মাঝখানে এমন এক স্রোত—
যেই স্রোত পার হওয়ার নাও আমার কোনো দিন আছিল না।

আমি ভাবছিলাম,
কোনো একদিন তুমি কইবা, ‘এই যে, এতদিন কই আছিলা?
আও, আমার বুকের ভিতর একটু জিরাইয়া লও।’
আমি তোমার হেই একটা কথার আশায় কত শত সন্ধ্যা বুকের ভিতর নামাইছি, কত অমাবস্যা জোছনা হইব বইলা আকাশের দিকে চাইয়া কাটাইছি!

অথচ তুমি আসো নাই।
আমার অপেক্ষার উঠানে ঘাস গজাইছে, স্বপ্নের দরজায় মাকড়সা জাল বুনছে, তবুও মনের বেহায়া পাখিটা তোমার ফেরার আশায় ডানা ঝাপটায়!

এখন মানুষ কয়, তোমারে ভুইলা যাইতে। আমি কই, কী দিয়া ভুলি?
তোমার লগে তো আমার কোনো বিচ্ছেদ হয় নাই, হয় নাই এক ছাদের নিচে সংসার ভাঙার গল্প;
শুধু বুকের ভিতর একটা সংসার সাজাইছিলাম, সেই সংসারে তুমি কোনো দিন আসো নাই—
তবুও সেই সংসারের ভাঙা থালাবাসনের শব্দ আজও আমার বুকের ভিতর বাজে!

জানো, না-পাওয়ারও একটা কবরস্থান আছে, সেইখানে মানুষ লাশ দাফন করে না, দাফন করে বুকের ভিতর জন্ম নেওয়া হাজারটা অনাগত দিন,
কত না-বলা কথা, কত একসাথে বুড়া হওয়ার স্বপ্ন!

আমার বুকেও তেমন একখান কবর আছে, নামফলকে তোমার নাম লেখা নাই, কারণ তোমারে কোনো দিন আমার কইরা পাওয়া হয় নাই;
তবুও প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই কবরের পাশে বইসা আমার মনটা নীরবে ফাতেহা পড়ে— একটা অসম্ভব ভালোবাসার জন্য!

তাই কেউ যখন কয়, ‘তুমি তারে হারাইছো’— আমি বুকের ভিতর জমে থাকা কান্নাটারে কোনোমতে থামাইয়া শুধু কই,

হারাইছি কেমনে?
যারে কোনো দিন হাতের মুঠোয় পাই নাই, যারে কোনো দিন আমার বইলা ডাকতে পারি নাই, যার জীবনের গল্পে আমার নামের একটা অক্ষরও নাই— তারে হারানোর অধিকারও তো আমার আছিল না!

আমি তো তোমারে পাইলামই না,
তবুও তোমারে না-পাওয়ার ব্যথায় আমার সারাটা জীবন হারাইয়া গেল—
এখন তুমিই কও,
এই হারানোর নাম কী দিমু,
আর তোমারে পাইলাম কই?

— লেখক, কলামিস্ট মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সরিষাবাড়ি জামালপুর।