
নিজস্ব প্রতিবেদক
হালাল রিজিকের পেছনে ছুটছি নিরন্তর। রবের কাছে বড় আশা—একদিন হয়তো তিনিই আমার জন্য এমন একটি দরজা খুলে দেবেন, যে দরজার সামনে আমাকে আর কারও সুপারিশ নিয়ে দাঁড়াতে হবে না। শুধু পরিশ্রম করব, ন্যায্য পাওনাটা পাব, পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচব।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।
সৎ থাকার চেষ্টা করতে করতে বারবার অনুচিতের গ্যারাকলে আটকে যাচ্ছি। যাদের বিশ্বাস করেছি, তাদের কেউ কেউ আমার টাকা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। পাওনা আদায়ের জন্য মামলা করে ঘুরছি মানুষের অনুগ্রহের আদালতে।
ফাইল আছে, কাগজপত্র যদি ঠিক থাকে, তদন্ত প্রতিবেদনও যদি সত্যের পক্ষে থাকে, তাহলে একজন মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারছে না কেন?
এই প্রশ্ন শুধু আমার নয়। এই প্রশ্ন আজ অসংখ্য ভুক্তভোগীর।
কাগজে সত্য, বাস্তবে অধিকারহীনতা
আমাদের ব্যবস্থায় প্রমাণের গুরুত্ব আছে। কাগজপত্র আছে, তদন্ত আছে, প্রতিবেদন আছে, সাক্ষ্য আছে। কিন্তু এসব থাকার পরও যদি একজন মানুষকে বছরের পর বছর তার অধিকার আদায়ের জন্য ঘুরতে হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে—সমস্যাটি কোথায়?
সমস্যা কি আইনে?
সমস্যা কি প্রয়োগে?
সমস্যা কি দীর্ঘসূত্রতায়?
নাকি প্রভাব, অর্থ ও যোগাযোগের কাছে একজন সাধারণ মানুষের সত্যও অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে?
একজন মানুষ যখন প্রমাণ হাতে নিয়ে প্রতিকারের দরজায় দাঁড়ান, তখন তার প্রত্যাশা খুব সাধারণ—ন্যায়বিচার। তিনি বিশেষ সুবিধা চান না, কারও অধিকার কেড়ে নিতে চান না। তিনি শুধু চান, তার নিজের অধিকারটি যেন তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু যখন প্রমাণ থাকার পরও প্রতিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের মনে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি জন্ম নেয়—
“তাহলে সত্য প্রমাণ করার পরও যদি অধিকার না পাই, সত্যের মূল্য কোথায়?”
মানুষের মনগড়া আদালত
মামলা করতে করতে আমি বুঝেছি, আদালত শুধু ভবনের ভেতরেই বসে না। মানুষের মনেও অনেক আদালত আছে।
কেউ নিজের মতো করে বিচার করে।
কেউ অপরাধীর সঙ্গে আপস করতে বলে।
কেউ বলে—“এতদিন যখন হয়নি, আর হবে না।”
কেউ আবার ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করে—“আপনি এতদিন কী করেছেন?”
কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না—যে মানুষটি প্রতারিত হয়েছে, তার সময়ের মূল্য কে দেবে? তার হারানো অর্থের মূল্য কে দেবে? তার মানসিক যন্ত্রণার মূল্যই বা কে দেবে?
আইনি প্রতিকার যদি বছরের পর বছর অপেক্ষার নাম হয়, তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়াটাই এক ধরনের সংগ্রাম হয়ে দাঁড়ায়।
জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলব কীভাবে?
আমি জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা বলি।
কিন্তু নিজের জীবনেই যখন দেখি—ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আমাকে লড়তে হচ্ছে, মামলা করতে হচ্ছে, কাগজপত্র নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে, তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে—তখন নিজের কাছেই প্রশ্ন করি,
কি করে বাঁচাবো জনগণের অধিকার, যখন নিজেই শত বৈষম্যের শিকার?
তবুও আমি থামতে চাই না।
কারণ নিজের ক্ষত আমাকে দুর্বল করার পাশাপাশি একটি শিক্ষা দিয়েছে—অধিকার হারানোর কষ্ট কেবল বই পড়ে বোঝা যায় না; তা অনুভব করতে হয়।
অধিকার আদায়ের পথে সবচেয়ে বড় বৈষম্য কোথায়?
বৈষম্য শুধু সম্পদের মধ্যে নয়। বৈষম্য রয়েছে সময়ের মধ্যেও।
একজন প্রভাবশালী মানুষ বছরের পর বছর একটি মামলা চালিয়ে যেতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো কয়েক মাসের আইনি খরচ বহন করতেই হিমশিম খান।
একজনের কাছে ভালো আইনজীবী পাওয়া সহজ। অন্যজনকে ধার করে মামলা চালাতে হয়।
একজনের ফোনে দরজা খুলে যায়। অন্যজনকে একই দরজায় বারবার কড়া নাড়তে হয়।
তাই ন্যায়বিচারের বাস্তব অর্থ শুধু এই নয় যে আইন সবার জন্য সমান। বাস্তব প্রশ্ন হলো—সেই আইনের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও কি সবার জন্য সমান?
এই জায়গাতেই রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও কঠিন আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হবে।
হালাল রিজিকের লড়াই
আমি হালাল রিজিক চাই। কারও হক মেরে নয়, কারও সঙ্গে প্রতারণা করে নয়, অন্যায় সুবিধা নিয়ে নয়।
কিন্তু একজন মানুষ যখন সৎ পথে চলেও নিজের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন, তখন শুধু তাকে ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া যথেষ্ট নয়।
সমাজকে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতারণা করে পালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে; যেখানে প্রমাণ থাকার পরও ভুক্তভোগীকে অসীম অপেক্ষায় থাকতে হবে না; যেখানে আইনি প্রতিকার শুধু কাগজে নয়, বাস্তব জীবনেও মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
কারণ ন্যায়বিচার যদি শুধু নথিতে থাকে, কিন্তু মানুষের জীবনে না পৌঁছায়—তাহলে সেই ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ।
নিজের অধিকার থেকেই জনগণের অধিকারের শিক্ষা
আমার ন্যায্য পাওনা যেমন অধিকার, একজন কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দামও অধিকার। একজন শ্রমিকের মজুরি যেমন অধিকার, একজন ব্যবসায়ীর বৈধ পাওনাও অধিকার। একজন নাগরিকের নিরাপত্তা যেমন অধিকার, তেমনি তার প্রতিকার পাওয়ার নিশ্চয়তাও অধিকার।
অধিকার কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়।
অধিকার কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
অধিকার কোনো ক্ষমতাবানের দয়া নয়।
অধিকার মানুষের।
আর তাই আমার ব্যক্তিগত লড়াইও বৃহত্তর একটি প্রশ্নের অংশ—আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়তে পারব, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ প্রমাণ হাতে নিয়ে দাঁড়ালে তাকে আর অসহায়ভাবে বলতে হবে না, “আমার কাগজ ঠিক, তদন্ত ঠিক—তবুও আমার অধিকার কোথায়?”**
আমার প্রার্থনা তাই খুব ছোট—
হে রব, আমাকে অন্যায়ের পথে নিও না। হালাল রিজিক দাও। আমার ন্যায্য পাওনা ফিরিয়ে দাও। আর যদি মানুষের অধিকারের কথা বলার শক্তি দিয়ে থাকো, তাহলে আমার জীবনেও ন্যায়ের বাস্তব স্পর্শ দাও।
কারণ আমি বিশ্বাস করি—
নিজের অধিকার হারিয়ে যে মানুষ কাঁদে, সে শুধু নিজের জন্য কাঁদে না;
তার কান্নার মধ্যে আরও হাজার মানুষের অধিকারহীনতার শব্দ লুকিয়ে থাকে।
আর সেই শব্দকে নীরব করে দেওয়া নয়—
ন্যায়বিচারের পথে তাকে উচ্চারণ করাই আমাদের দায়িত্ব।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক
সরিষাবাড়ি জামালপুর