
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অধ্যায় শুরু হয়েছে। ২০ আগস্ট ২০২৬ সংসদে ভোটের মাধ্যমে বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন, আর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। এটি ১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ২১ আগস্ট তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
একজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ তিনি এতদিন ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা; এখন তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করবেন। এখানেই তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি কতটা নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হলেও রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে এই পদটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। তাই জাতির প্রত্যাশা খুবই স্বাভাবিক—রাষ্ট্রপতি যেন কোনো দলের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি একদিকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েনও রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এসেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন।
এই পরিস্থিতিতে নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রথম প্রত্যাশা—জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকবে, দল থাকবে, বিরোধী দল থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্র সবার। অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় প্রত্যাশা—আইনের শাসন নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে না থাকেন, আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ যেন অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকারও না হন। অপরাধের বিচার হবে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে—এটাই হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলনীতি।
তৃতীয় প্রত্যাশা—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা রক্ষা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারে—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতির নৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ প্রত্যাশা—রাজনৈতিক সহনশীলতা। সরকার ভালো কাজ করলে বিরোধী দল তার সমালোচনা করবে, আবার বিরোধী দলের যৌক্তিক বক্তব্যও সরকারকে শুনতে হবে। সংসদ যেন শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গা না হয়ে জনগণের সমস্যা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পঞ্চম প্রত্যাশা—জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার। মানুষ রাজনীতি নিয়ে আতঙ্কিত নয়, বরং নিরাপদভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে চায়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে, নাগরিক তার অধিকার নিয়ে কথা বলবে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীক হবে—এমন বাংলাদেশই আজ মানুষের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের সামনে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে এবং কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা—দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। কোনো বিদেশি শক্তির চাপ নয়, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাই হবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
সবশেষে বলতে চাই, নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তিনি চাইলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের বার্তা দিতে পারেন। তিনি চাইলে প্রমাণ করতে পারেন—একজন রাজনীতিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে গিয়ে দলীয় সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন।
জাতি এমন একজন রাষ্ট্রপতি চায়, যিনি ক্ষমতার নয়, সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন; কোনো দলের নয়, জনগণের রাষ্ট্রপতি হবেন; প্রতিহিংসার নয়, ন্যায়বিচারের কথা বলবেন; বিভাজনের নয়, জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেবেন।
বাংলাদেশের মানুষ অতীতের সংঘাত ভুলে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ চায়। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি যদি এই প্রত্যাশাগুলোকে ধারণ করে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তার মেয়াদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ইতিবাচক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
এখন সময় রাজনীতিকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার, রাষ্ট্রকে সবার করে তোলার এবং বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার।আসুন দলমত নির্বিশেষে সবার আগে বাংলাদেশ, এ দেশকে রক্ষা করি আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।