
নিজস্ব প্রতিবেদক :
গ্যাস সংকটের অজুহাতে টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া উৎপাদনকারী যমুনা সার কারখানা। অথচ সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিদিনই উৎপাদন করা সম্ভব ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার। উৎপাদন বন্ধ থাকায় গত আড়াই বছরে বিদেশ থেকে সার আমদানিতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আর কৃষি খাত হয়েছে আরও বেশি আমদানিনির্ভর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্যাস সংকটের কারণ দেখিয়ে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারখানার চিমনিতে আর ধোঁয়া ওঠেনি। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন যন্ত্রপাতিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে সার আমদানির পেছনে গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অর্থ।
কারখানাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকলেও দৈনিক গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব ছিল। সেই হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন সার উৎপাদনের সুযোগ হারিয়েছে রাষ্ট্র।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশ থেকে প্রতি টন ইউরিয়া সার আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮৮ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাসে ৩৬ হাজার টন সার আমদানিতে সরকারের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ একই পরিমাণ সার দেশে উৎপাদনে খরচ হতো মাত্র ৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে আড়াই বছরের বেশি সময়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় শুধু সরকারি ভর্তুকির বোঝা বাড়াচ্ছে না, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। দেশীয় শিল্প সচল থাকলে যে অর্থ দেশের ভেতরেই আবর্তিত হওয়ার কথা ছিল, তা এখন বিদেশে চলে যাচ্ছে।
দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) পরিচালক চান মিয়া চানু বলেন, যমুনা সার কারখানা একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর উৎপাদন বন্ধ থাকলে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যমুনার উৎপাদিত সারের মান ভালো হওয়ায় কৃষকদের চাহিদাও বেশি। উৎপাদন বন্ধ মানেই আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও গ্যাস সংকটের কারণে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডিলাররা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি অসাধু একটি চক্র পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কালোবাজারে বেশি দামে সার বিক্রি করছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আমদানি করা সারের গুণগত মান ও ওজন নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে কম সার দেওয়া হচ্ছে। নিম্নমানের সার ব্যবহারের কারণে একই জমিতে আগের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না।
বিএফএর রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সরদার বলেন, যমুনা কারখানার উৎপাদিত সারের মান ভালো হওয়ায় কৃষকদের কাছে এর চাহিদা বেশি। উৎপাদন বন্ধ থাকলে বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। অতীতেও আমদানি করা সার নিয়ে মান ও দামের অভিযোগ ছিল। কৃষকদের স্বার্থে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, যমুনা সার কারখানা সচল রাখতে মাত্র ৪২ থেকে ৪৩ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন। তাদের মতে, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ সাময়িক সমন্বয় করলেই কারখানাটি চালু রাখা সম্ভব। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা নয়; এটি জ্বালানি পরিকল্পনা, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাতীয় ইস্যু। দীর্ঘদিন দেশীয় উৎপাদন বন্ধ রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পুরো প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও কৃষকদেরই বহন করতে হবে।
যমুনা সার কারখানার জিএম (অপারেশন) ফজলুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় আড়াই বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতিতে ত্রুটি বাড়ছে। জাপানি প্রযুক্তিতে নির্মিত এই কারখানায় নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সারের আমদানিনির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
এ বিষয়ে যমুনা সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফাস উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।