
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) প্রতিনিধি মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল
গোদাগাড়ী রাজশাহী বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র গোদাগাড়ী উপজেলার সরমংলা ইকো পার্ক’। তবে উদ্বোধনের পর বর্ষার প্রথম ধাক্কাতেই ধসে পড়েছে পার্কটির নবনির্মিত দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে ও গাইড ওয়াল। খাড়ির পাড়ের একটি বড় অংশ ধসে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় লোহার রঙিন নিরাপত্তা রেলিং ও দর্শনার্থীদের বসার বেঞ্চ এখন শূন্যে ঝুলছে। যেকোনো মুহূর্তে পুরো কাঠামোটি খাড়ির গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA), রাজশাহী-এর ব্যবস্থাপনায় ‘বরেন্দ্র এলাকায় খালে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ (২য় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় এই কোটি টাকার সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু টেকসই ও নিরাপদ গাইড ওয়াল না দিয়ে, স্রেফ আলগা মাটির ওপর এই জোড়াতালির কাঠামো তৈরি করায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। এটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের চরম দুর্নীতি ও লুটপাটের ফল হিসেবে দেখছেন তারা।

সবুজ ‘গ্রিন হাউস এখন ধ্বংসস্তূপ
২০০৩ সালের ৫ই জুন গোদাগাড়ী উপজেলার ডাইংপাড়া মোড় থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার পূর্বে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক কৃত্রিম খাল ও তার দুপাশে গড়ে ওঠা ঘন বনায়ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এই সরমংলা ইকো পার্ক। আম, জাম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের ছায়ায় ঘেরা মনোরম পরিবেশের কারণে পর্যটকদের কাছে এটি ‘গ্রিন হাউস’ নামে পরিচিত।

পার্কের মূল আকর্ষণই হলো সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (SEMP), UNDP এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পদ্মা নদী থেকে ৩.৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূ-গর্ভস্থ পাইপলাইনের মাধ্যমে এই খাড়িতে পানি সঞ্চালন। দর্শনার্থীরা যেখানে লেকের পাড়ে বসে এই পানি আসার দৃশ্য ও ছায়াঘেরা ওয়াকওয়ে উপভোগ করতেন, আজ সেখানে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন।
সিমেন্টের বদলে বালুর রাজত্ব কারিগরি ত্রুটির খতিয়ান
সরেজমিনে ভেঙে পড়া কংক্রিট ও ইটের গাঁথুনি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মিশ্রণে সিমেন্টের পরিমাণ ছিল নামমাত্র। সঠিক অনুপাত (Concrete Mixing Ratio) না মেনে বালুর পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি দেওয়ায় কাঠামোটি সামান্য পানির চাপেই ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২০২৫ সালের ২৮শে আগস্ট (১৩ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) এই প্রকল্পের বড় অগ্রগতি বা কাজের আনুষ্ঠানিকতার পর থেকেই তড়িঘড়ি করে মূলত সরকারি টাকা লুটপাটের আয়োজন করা হয়।
অনুসন্ধানে প্রকল্পটির একাধিক মারাত্মক কারিগরি ত্রুটি ও গাফিলতি উঠে এসেছে।
সয়েল টেস্ট ও সার্ভের অভাব খাড়ির পাড়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভাঙনপ্রবণ জায়গায় কাজ করার আগে কোনো সয়েল টেস্ট (Soil Test) কিংবা হাইড্রোলজিক্যাল সার্ভে করা হয়নি। পদ্মা নদীর পানির তীব্র স্রোত ও খাড়ির পানির স্তর ওঠানামার হিসাব না করেই স্রেফ ওপরের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে আইওয়াশ করা হয়েছে।

ভারী কাঠামো নির্মাণের আগে রোলার দিয়ে মাটি শক্ত (Compact) করার কঠোর নিয়ম থাকলেও, ঠিকাদার আলগা ও ফাঁপা মাটির ওপর সস্তায় ইট বিছিয়ে দেয়। ফলে বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢোকা মাত্রই মাটি ধুয়ে নিচের অংশ শূন্য হয়ে পুরো ওয়াকওয়ে দেবে গেছে।
খাড়ির পাড় রক্ষায় যেখানে শক্তিশালী রিটেইনিং ওয়াল বা আরসিসি পাইলিংয়ের প্রয়োজন ছিল, সেখানে তা করা হয়নি। কোন প্রকৌশলী এই আত্মঘাতী ডিজাইন পাস করেছেন, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের বখরার বিনিময়ে চোখ বন্ধ করে ঠিকাদারের এই অনিয়ম মেনে নিয়েছেন বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এত বড় বিপর্যয়ের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা পরিস্থিতি আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
পারিবারিক পিকনিক ও বিনোদনের জন্য দারুণ জনপ্রিয় এই পার্কে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু ও পরিবার ঘুরতে আসে। ওয়াকওয়ের এই বড় বড় গর্ত আর শূন্যে ঝুলন্ত রেলিং এখন একেকটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে অসাবধানতাবশত কোনো শিশু বা দর্শনার্থী গভীর খাড়িতে পড়ে গিয়ে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গোদাগাড়ীর সচেতন মহলের জোর দাবি অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার ও ডিজাইনকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সাথে জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী সিসি ব্লক ও রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে এই অংশ পুনরায় সংস্কার করে ঐতিহ্যবাহী সরমংলা ইকো পার্কটিকে বাঁচানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BMDA) কর্মকর্তা লতিফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায়সারা বক্তব্য দেন। তিনি জানান, এই সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে মূল প্রকল্পে কোনো বাজেট ছিল না। পাইপ লাইনের কাজের সময় ঠিকাদারকে দিয়ে আলাদাভাবে আমরা এই কাজটি করিয়ে নিয়েছি।
ওয়াকওয়ে ও গাইড ওয়াল ধসে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, ভারী বর্ষার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে।তবে কাজের চরম অনিয়ম, গাফিলতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলা হলে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান এবং কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
রাজশাহী গোদাগাড়ী প্রতিনিধি
মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল
01712483534