
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমরা প্রায়ই বলি—জাপান, চীন কিংবা ইউরোপের মতো আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই। কিন্তু একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরই করা উচিত—সেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরির জন্য আমরা কি প্রস্তুত?
আধুনিক শিক্ষা শুধু নতুন পাঠ্যবই, স্মার্ট বোর্ড কিংবা ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের নাম নয়। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিক্ষক গবেষণা করবেন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শিখবে, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে জ্ঞানচর্চার স্বাধীন কেন্দ্র।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির প্রভাব। যখন শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন যোগ্যতা ও মেধা পিছিয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত পুরো জাতি।
জাপানের শিক্ষক সমাজ রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনকে অগ্রাধিকার দেয়। চীন প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেয়। ইউরোপের অনেক দেশে শিক্ষকের পেশাগত স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা এবং গবেষণার পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়—মানসম্মত শিক্ষা গড়ে ওঠে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং মেধার ভিত্তিতে।
একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো শুধু পাঠ্যবই শেষ করার মধ্যে তাঁর দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা, চরিত্র, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব নিজের নৈতিক কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন। একজন শিক্ষকের মধ্যে এমন মানসিকতা থাকা উচিত যে, তাঁর কাছে অর্পিত প্রতিটি শিক্ষার্থীর বিকাশের জন্য তিনি শতভাগ দায়িত্বশীল। শিক্ষার্থীর সাফল্যকে নিজের সাফল্য এবং শিক্ষার্থীর ব্যর্থতাকে নিজের আত্মসমালোচনার বিষয় হিসেবে দেখার সংস্কৃতিই একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশেও যদি সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, তাহলে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। তৃতীয়ত, গবেষণা, প্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমন পরিবেশে পরিচালিত করতে হবে, যেখানে শিক্ষকের প্রধান পরিচয় হবে তিনি একজন শিক্ষক—কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ধারক নন।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, নাগরিক হিসেবে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত বা অধিকার রয়েছে। আলোচনার মূল বিষয় হওয়া উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, নিয়োগ ও একাডেমিক কার্যক্রম যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত এবং পেশাদার নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। তাই যদি আমরা সত্যিই জাপান, চীন কিংবা ইউরোপের মতো দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে চাই, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে মেধা, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষা কখনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়; এটি জাতি গঠনের সবচেয়ে পবিত্র অঙ্গন।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর