
নিজস্ব প্রতিবেদক
মা—এই একটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সবচেয়ে নির্মল মমতা এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষের জন্য যত নিয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে মা নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। একজন মা তার সন্তানের জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না। রাত জেগে সন্তানের পাশে থাকা, নিজের ক্ষুধা ভুলে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া—এসবই মায়ের ভালোবাসার নিঃশব্দ ভাষা।
কিন্তু কখনো যদি দেখা যায়, সেই মা-ই নিজের স্বার্থের জন্য সন্তানকে ভুলে যান, তখন প্রশ্ন জাগে—এমন আচরণকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করবো? এটি কি মায়ের স্বাভাবিক রূপ, নাকি সময়ের নির্মম বাস্তবতা?
প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে, মা-ও একজন মানুষ। তারও রয়েছে অনুভূতি, কষ্ট, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব জীবনের নানা চাপ। কখনো কখনো পরিস্থিতি একজন মানুষকে এমন জায়গায় ঠেলে দেয়, যেখানে সে নিজের অজান্তেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। হয়তো অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা ব্যক্তিগত অসহায়ত্ব একজন মাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তিনি সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন।
তবে এটাও সত্য, মায়ের ভালোবাসা সাধারণত নিঃশর্ত হয়। তাই যখন কোনো মা নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সন্তানকে উপেক্ষা করেন, তখন সেটি স্বাভাবিকতার বাইরে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। সমাজ তখন তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ মানুষের বিশ্বাস—মা কখনো সন্তানের ক্ষতি চান না।
কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি শুধুই বিচার করবো, নাকি বোঝার চেষ্টা করবো? একজন মা কেন এমন আচরণ করছেন, তার পেছনের গল্পটা কী—সেটি জানাও জরুরি। অনেক সময় আমরা বাহ্যিক দৃশ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, অথচ বাস্তবতা হয়তো অনেক গভীর এবং বেদনাদায়ক।
ইসলামেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। মহানবী (সা.) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।” এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মায়ের সম্মান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো মা যদি ভুল করেন, সেটিকে শুধুই দোষ হিসেবে না দেখে, তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও আমাদের।
সবশেষে বলা যায়, যে মা নিজের স্বার্থের জন্য সন্তানকে ভুলে যায়, তাকে শুধুই “খারাপ মা” বলে চিহ্নিত করা সহজ, কিন্তু সেটি সমস্যার সমাধান নয়। বরং আমাদের উচিত তার পরিস্থিতি বোঝা, তাকে সহানুভূতির চোখে দেখা এবং প্রয়োজনে তাকে সহায়তা করা। কারণ, মা কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে তার সন্তানের ক্ষতি চান না—বরং পরিস্থিতির চাপে তিনি কখনো কখনো নিজের পথ হারিয়ে ফেলেন।
মা মানেই ভালোবাসা, মা মানেই ত্যাগ। আর যদি কোনো মা সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন, তাহলে তাকে দোষারোপ নয়—ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সচেতনতার মাধ্যমে আবার সেই আলোয় ফিরিয়ে আনা আমাদের মানবিক দায়িত্ব।