
নিজস্ব প্রতিবেদক
আজকের সমাজে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এক সময় মানুষ পুলিশের নাম শুনলে ভয় পেত, লুকিয়ে যেত, দূরে সরে দাঁড়াত। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মানুষ আজ পুলিশের ভয়ে পালায় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছে বিচার চায়, সাহায্য চায়। অথচ একই সমাজে, সাংবাদিকদের নাম শুনলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়, বিরূপ মন্তব্য করে, এড়িয়ে চলতে চায়। কেন এই পরিবর্তন? এর জন্য দায়ী কে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্যের কাছে। সাংবাদিকতা একসময় ছিল সত্যের অনুসন্ধান, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। একজন সাংবাদিক ছিলেন সমাজের দর্পণ—যেখানে প্রতিফলিত হতো মানুষের সুখ-দুঃখ, অন্যায়-অবিচার, এবং প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই মহান পেশার ভেতরে ঢুকে পড়েছে কিছু অসৎ প্রবণতা, কিছু ব্যক্তিগত স্বার্থ, কিছু অপব্যবহার।
আজ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। কেউ হয়তো ক্ষমতার দম্ভ দেখায়, কেউ বা ব্ল্যাকমেইল করে, আবার কেউ মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এই ধরনের আচরণ শুধু একটি ব্যক্তি নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের উপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানুষ একসময় সাংবাদিক দেখলে স্বস্তি পেত, ভাবত—এরা আমাদের কথা বলবে, আমাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু এখন অনেকেই মনে করে, “সাংবাদিক মানেই ঝামেলা”, “সাংবাদিক মানেই হয়তো কোনো স্বার্থ আছে”। এই ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, তার বড় একটি অংশের দায় স্বীকার করতেই হবে সাংবাদিকদেরই।
তবে এটাও সত্য, সব সাংবাদিক এক রকম নয়। এখনো অনেক নিষ্ঠাবান, সাহসী, এবং সৎ সাংবাদিক আছেন, যারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু অসৎ মানুষের কর্মকাণ্ড সেই সৎ মানুষগুলোর সম্মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দিচ্ছে।
একটি পেশার মর্যাদা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা এবং আত্মশুদ্ধি। সাংবাদিকদেরও আজ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেদের দিকে তাকানো জরুরি। প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছি? আমরা কি আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছি?
সমাজের আস্থা ফিরে পেতে হলে সাংবাদিকদের হতে হবে আরও দায়িত্বশীল, আরও নিরপেক্ষ, আরও সতর্ক। সংবাদ প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই করতে হবে, ব্যক্তিগত স্বার্থকে দূরে রাখতে হবে, এবং সর্বোপরি—মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাংবাদিকতা কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব—এই উপলব্ধি আবারও ফিরিয়ে আনতে হবে।
একইসাথে, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত সঠিক নীতি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, যেন কেউ সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কাজ করতে না পারে। প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা শিক্ষা এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, মানুষের আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। সততা, নিষ্ঠা এবং সঠিক পথ অনুসরণের মাধ্যমে সাংবাদিকরা আবারও সেই আস্থা অর্জন করতে পারেন। আবারও মানুষ বলতে পারবে—“সাংবাদিক মানেই সত্যের কণ্ঠস্বর।”
পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা চাই। আর সেই পরিবর্তনের শুরুটা হতে হবে আমাদের নিজেদের থেকেই।আসুন আগামী প্রজন্মকে একটি স্বচ্ছ সুন্দর সাংবাদিক প্লাটফর্ম তৈরী করে দেই। যারা এ পেশায় আসতে চায় তাদের অভিনন্দন জানিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করি, সাংবাদিকতার নীতি আদর্শের ভবিষ্যৎ তৈরি করি।