
নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্প্রতি জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ছেলেকে জমি লিখে না দেওয়ায় বৃদ্ধা মা রাশেদা বেগমকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। কোরআন শরীফ বুকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছাড়ার এই ভিডিওটি লাখো নেটিজেনের হৃদয় ভাঙলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ঘটনার আড়ালে থাকা এর পেছনের এক ভিন্ন চাঞ্চল্যকর সত্য ঘটনা। গত ৭ জুলাই সাংবাদিক সম্মেলন করে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেন, এটি কোনো নির্মম সন্তান কর্তৃক মাকে বের করে দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং সৎ মা তার নিজের সন্তানদের বঞ্চিত করে মায়ের সম্পত্তি ও পেনশনের টাকা হাতিয়ে নিতে মামাদের সাজানো এক চরম নাটক।পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সরিষাবাড়ী উপজেলার ২নং পোগলদিঘা ইউনিয়নের গেন্দারপাড়া গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক গুঠু তালুকদারের প্রথম স্ত্রী নাদিয়া ইয়াসমিন লুনা, লিজা আক্তার ও জাহাঙ্গীর আলম নামের তিন সন্তান রেখে মারা যায়। শিশু সন্তানদের কথা ভেবে দ্বিতীয় বিয়ে করতে রাজি হয় মোজাম্মেল হক গুঠু। বিয়ে করেন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি উপজেলার ১বীরতারা ইউনিয়নের বাশনীগি গ্রামের আরফান আলী সরকারের মেয়ে রাশেদা বেগমকে। রাশেদার গর্ভে জন্ম নেয় অভিযুক্ত রাশেদুল ইসলাম জাকির। অভিযুক্ত ছেলে রাশেদ, তার সৎ ভাই জাহাঙ্গীর এবং গ্রামবাসীদের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে যমুনা সারকারখানা প্রতিষ্ঠার সময় প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বাবার বাড়ির সম্পত্তি বাবদ ২৫,০০০ টাকা পায় এতিম তিন সন্তান, তখন তারা সবাই ছোট নাবালক প্রথম পক্ষের সন্তানেরা ছোট থাকার সুযোগে রাশেদা বেগম তার স্বামীকে ভুল বুঝিয়ে বুঝিয়ে সেই টাকার সাথে আরও টাকা যোগ করে বাবার বাড়ি কেন্দুয়া এলাকায় ৮ বিঘা জমি কিনেন, যে জমির অধিকাংশই রাশেদা বেগম এর নামে। জমি কেনার দায়িত্বে ছিলেন রাশেদা বেগমের বাবা আরফান আলী সরকার। তিনি জামাতার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রথম পক্ষের দুই মেয়েকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করেন এবং নিজের মেয়ে রাশেদার নামে ৪ বিঘা, প্রথম পক্ষের ছেলে জাহাঙ্গীর ও নাতি রাশেদের নামে ৩ বিঘা এবং জামাতার নামে সামান্য জমি কিনে দেয়। জমি কেনার পর থেকেই রাশেদা বেগমের ভাইয়েরা রাশেদুল ইসলাম (মামারা) সেই জমি নিজেদের দাবি করে চাষাবাদ করে আসছেন।অদ্যবদি পর্যন্ত জমির কোন ফসল পায়নি তারা। এখানেই শেষ নয়, রাশেদা বেগম এর বাবা আরফান আলী সরকার মারা যাওয়ার পর পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের দুই বিঘা জমি তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা ও ১নং বীরতারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহাম্মদ আল ফরিদ তার নিজের নামে লিখে নিয়েছে
মোজাম্মেল হকের মৃত্যুর পর তার পেনশনের ৪ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসের ১৮,০০০ টাকা বেতনও রাশেদা বেগম একাই ভোগ করছেন,যাতে সৎ সন্তানেরা নিজেদের মা মনে করে লিখিত অনুমতি দিয়েছেন।
নিজ সন্তান ও সৎ সন্তানদের অভিযোগ— মায়ের সাথে তাদের কোনো বিবাদ নেই; বরং বিবাদ বাধিয়ে রেখেছেন তাদের মামা বিশেষ করে বড় মামা ও স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আহাম্মেদ আল ফরিদ।
ভাগিনারা তাদের নিজেদের নামের সম্পত্তি বিক্রি করতে গেলে চেয়ারম্যান ফরিদ ও তার অনুসারীরা বাধা দেন এবং নামমাত্র মূল্যে তাদের কাছে বিক্রি করতে হুমকি দেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কোরআন বুকে নিয়ে রাশেদা বেগমের বাড়ি ছাড়ার ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন ছেলে রাশেদুল ইসলাম ও এলাকাবাসী। তারা জানান, ”সেদিন আহাম্মেদ আল ফরিদ মামাই আমাদের বাড়িতে এসে মাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গেছেন।ভিডিও করার জন্য আগে থেকেই একজন সংবাদ কর্মীকে নিয়ে এসেছিলেন। মাকে নিজেদের জিম্মায় রাখলে মামাদের বড় লাভ। একদিকে মায়ের সম্পত্তি তারা ভোগ করতে পারবে, অন্যদিকে প্রতি মাসে মায়ের কাছে আসা পেনশনের মোটা অঙ্কের নগদ টাকাও তারা হাতিয়ে নিতে পারবে। এ বিষয়ে প্রথম পক্ষের মেয়ে নাদিয়া ইয়াসমিন লুনা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন আমরা যে কষ্ট মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি, সেটা আর বলতে চাই না আশাবাদী মা তার ভুল বুঝতে পেরে আমাদের কাছে ফিরে আসবে।
প্রথম পক্ষের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন, ”রাশেদা বেগম আমার সৎ মা হলেও তাকে আমরা কখনো আলাদা করে দেখিনি। বাবার পেনশনের টাকাও তাকে আমরা দিয়ে দিয়েছি।আমরা চাই মা ভুল তার ভুল বুঝতে পেরে আমাদের কাছে ফিরে আসুক। আমরা তাকে মায়ের মমতায় আজীবন আগলে রাখবো। আসল ঘটনা আড়াল করতে মাকে দিয়ে একমাত্র ছেলের বিরুদ্ধে করা ভরনপোষণ এর মামলা দিয়ে মা। পুলিশ তাকে আটক করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।
বর্তমানে এই ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী সন্তানেরা সামাজিক সম্মানহানি এবং মামাদের এই নোংরা চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি জামান , মায়ের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতেই অভিযুক্ত রাশেদুল ইসলামকে আটক করে করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, আইনের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে