
নিজস্ব প্রতিবেদক
আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অধিক সম্পদের প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষ করে রক্তের সম্পর্ক—ভাই-ভাই, বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে—যে সম্পর্কগুলো ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোই আজ সম্পদের লোভে ভেঙে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল, যখন পরিবার মানেই ছিল একসাথে থাকা, একসাথে খাওয়া, একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাই, সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাই, সন্তানের বিরুদ্ধে পিতা—এমনকি আদালত পর্যন্ত গড়ায় সেই সম্পর্কের দ্বন্দ্ব। প্রশ্ন জাগে—এই সম্পদ কি সত্যিই আমাদের সুখ এনে দিচ্ছে, নাকি আমাদের কাছের মানুষগুলোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে?
অধিক সম্পদ মানুষের মনে অহংকার তৈরি করে, লোভ বাড়ায়, এবং অনেক সময় মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। তখন সম্পর্কের চেয়ে টাকা বড় হয়ে যায়। ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় হিসাব-নিকাশ, বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয় সন্দেহ। ফলে ধীরে ধীরে সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একসময় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়।
কিন্তু আমরা যদি একটু ভেবে দেখি, এই পৃথিবীতে আসার সময় কেউ কিছু নিয়ে আসেনি, আবার চলে যাওয়ার সময়ও কিছু নিয়ে যেতে পারবে না। তাহলে এই অস্থায়ী সম্পদের জন্য কেন আমরা চিরস্থায়ী সম্পর্কগুলো নষ্ট করবো?
আমাদের উচিত, সম্পদ জমা করার পাশাপাশি আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা মানুষ হিসেবে বড় হয়। শুধু অর্থ-সম্পদ দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া যায় না, তাদের প্রয়োজন সুশিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং মানবিকতা।
সন্তানকে যদি আমরা সৎ হতে শেখাই, অন্যের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখাই, সত্য কথা বলতে শেখাই, তাহলে সেই সন্তানই একদিন পরিবারের গর্ব হয়ে উঠবে। সে কখনো সম্পদের জন্য নিজের আপনজনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। বরং সে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেবে, ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দেবে।
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো সন্তানদের সুশিক্ষা। তাদেরকে এমন শিক্ষা দিন, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগে। তাদেরকে শেখান—সম্পদ নয়, মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
আমরা যদি চাই আমাদের পরিবার সুখী হোক, আমাদের সম্পর্কগুলো অটুট থাকুক, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সম্পদ অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্পর্ককে ধরে রাখা।
শেষ কথা হলো—অধিক সম্পদ নয়, সুশিক্ষিত সন্তানই হলো প্রকৃত সম্পদ। যে সন্তান পরিবারকে একত্রে রাখতে পারে, যে সন্তান ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে পারে, সেই সন্তানই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাই আসুন, আমরা সম্পদের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে না গিয়ে, আমাদের সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। কারণ, সুশিক্ষিত ও মানবিক সন্তানই পারে একটি পরিবারকে সুন্দর রাখতে, একটি সমাজকে আলোকিত করতে।