
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে এখন নেতা হওয়ার মানুষের অভাব নেই, অভাব আছে নেতৃত্বের। রাজনৈতিক সভা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের দোকান, এমনকি পারিবারিক আড্ডাতেও নেতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই নেতৃত্ব সৃষ্টি করছি, নাকি শুধু নেতার পরিচয় ধারণ করছি?
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নেতৃত্ব এসেছে মানুষের প্রয়োজন থেকে। তখন রাজনীতি ছিল একটি আদর্শিক অঙ্গীকার, ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট নয়। নেতারা রাজনীতিতে আসতেন মানুষের জন্য, নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিও বদলেছে। আজ রাজনীতি অনেকাংশে একটি পেশায় পরিণত হয়েছে। পেশাদার রাজনীতি নিজে খারাপ কিছু নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনীতি একটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন রাজনীতি জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা ব্যক্তিগত সুযোগ লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক কর্মী তৈরির চেয়ে পদধারী নেতা তৈরির প্রতিযোগিতা বেশি দেখা যায়। কেউ নেতা হতে চায়, কিন্তু কর্মী হতে চায় না। সবাই মঞ্চে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু মাঠে দাঁড়ানোর মানুষ কমে যাচ্ছে।
একসময় রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থাকতে হতো। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ঘুরে ঘুরে জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে হতো। এখন অনেকেই রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি না দিয়েই নেতৃত্বের আসনে বসতে চান। এর ফলে রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
পেশাদার রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জবাবদিহিতা। একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ জানবেন, জনগণই তাঁর মূল শক্তি। জনগণের সমর্থন হারালে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হবে। কিন্তু যখন রাজনীতি জনগণ থেকে দূরে সরে যায়, তখন নেতৃত্বও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। আমরা নেতাকে অনুসরণ করি, কিন্তু নেতৃত্বের গুণাবলি চর্চা করি না। নেতৃত্ব মানে শুধু বক্তৃতা নয়; নেতৃত্ব মানে সততা, সহনশীলতা, দূরদর্শিতা এবং সংকটের সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার সাহস। নেতা হওয়ার আগে মানুষ হওয়া জরুরি—এই সহজ সত্যটি আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য প্রয়োজন আদর্শভিত্তিক, শিক্ষিত, দক্ষ ও জনমুখী নেতৃত্ব। এমন নেতৃত্ব, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার চেয়ে জনগণের আস্থা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেবেন। যারা পদ নয়, দায়িত্বকে বড় মনে করবেন। যারা ক্ষমতাকে ভোগের বিষয় নয়, সেবার সুযোগ হিসেবে দেখবেন।
আজ আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখা দরকার—আমরা সবাই নেতা-নেতা হলাম, কিন্তু সত্যিকার অর্থে কয়জন নেতৃত্ব দিতে শিখলাম? কয়জন মানুষের দুঃখ বুঝতে পারলাম? কয়জন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলাম?
নেতার সংখ্যা বাড়লেই নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে না। নেতৃত্ব জন্ম নেয় আদর্শ, ত্যাগ, দক্ষতা ও জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। সেই নেতৃত্বের চর্চাই হোক বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর