
নিজস্ব প্রতিবেদক
জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার ২নং পোগলদিঘা ইউনিয়নের যমুনা সার কারখানা—জেএফসিএল আবাসিক কলোনিতে গভীর রাতে একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি ইয়ামাহা ( R15) V3 মোটরসাইকেল পুড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। আগুন লাগার কয়েক ঘণ্টা আগে মোটরসাইকেলের মালিক তাসলিমূল ইসলামের সঙ্গে এক যুবকের কথাকাটাকাটি, পরে ফোনে দেখা করতে বলা এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি এখন রহস্যের জট খুলতে তদন্তের দাবি উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে ৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে। জেএফসিএল আবাসিক কলোনির ই-৩ ও ই-৫ নম্বর ভবনের মাঝামাঝি এলাকায় সিঁড়ির নিচে রাখা ছিল তাসলিমূল ইসলামের ইয়ামাহা (R15) V3 মোটরসাইকেলটি।

রাতের নীরবতার মধ্যে হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাসলিমূলের। চারতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, মোটরসাইকেলটি দাউ দাউ করে জ্বলছে।
পরে তিনি বন্ধুদের নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন মোটরসাইকেলের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও মোটরসাইকেলটি ব্যাপকভাবে পুড়ে যায়।
তাসলিমূলের অভিযোগ, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। আর এ ঘটনায় তিনি মো. মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসান নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার বিষয়ে তাসলিমূল ইসলাম সরিষাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
কিন্তু আগুনের কয়েক ঘণ্টা আগে কী ঘটেছিল?
অভিযোগে বলা হয়েছে, ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে তাসলিমূল কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে জেএফসিএল আবাসিক কলোনিতে যান। সেখানে পরিচিত হাসানের সঙ্গে তার দেখা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাসান তাসলিমূলের মোটরসাইকেলটি কিছু সময়ের জন্য চান। তবে তাসলিমূল মোটরসাইকেল দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে গালিগালাজ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর তাসলিমূল তার বন্ধু মহাইমিনুর রহমান বিদ্যুতের ই-৩ নম্বর বাসায় চলে যান।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাত আনুমানিক ৯টার দিকে হাসান মোবাইল ফোনে তাসলিমূলকে দেখা করতে বলেন। তাসলিমূল দেখা করতে অস্বীকৃতি জানালে রাত ১০টার দিকে আবার ফোন করা হয়। ওই ফোনে তাকে কলোনি থেকে বের হতে নিষেধ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তাসলিমূল।
আর এর কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা।
এই ধারাবাহিক ঘটনাই এখন সামনে আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মোটরসাইকেল দেওয়াকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটি ও পরবর্তী কথিত হুমকির সঙ্গে আগুন দেওয়ার ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না?
তবে অভিযোগে থাকা এসব তথ্যের সত্যতা এখন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আগুনের পরও হুমকির অভিযোগ
তাসলিমূলের আরও অভিযোগ, মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি ভবনের ওপরের তলায় উঠে তাকে হুমকি দেন।
তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ভবনের বাসিন্দা, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—গভীর রাতে আবাসিক কলোনির ওই এলাকায় কে বা কারা চলাচল করেছিল? সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে ফুটেজে কী পাওয়া গেছে? মোটরসাইকেলে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ কী?
এগুলোই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
জেএফসিএল আবাসিক কলোনি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক এলাকা। সেখানে গভীর রাতে একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির সম্পদের ক্ষতির বিষয় নয়; এটি পুরো আবাসিক এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি আবাসিক এলাকায় রাতের নিরাপত্তা ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তদন্তেই বেরিয়ে আসবে আসল সত্য
এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরপেক্ষ তদন্ত।
অভিযোগে উল্লেখ করা মোবাইল ফোনের কথিত যোগাযোগ যাচাই, ঘটনাস্থলের আলামত পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি অভিযোগে যেসব পূর্ববিরোধ ও হুমকির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোরও সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
এদিকে, ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে যার নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, মো. মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসানের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা অবশ্যই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সব মিলিয়ে, জেএফসিএল কলোনিতে মধ্যরাতে একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি এখন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে? কে বা কারা আগুন দিয়েছে? আগের কথাকাটাকাটি ও কথিত ফোনে হুমকির সঙ্গে এই অগ্নিকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।
তবে অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
তাই প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সঠিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই।
তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হোক—এটাই এখন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।এ বিষয়ে সরিষাবাড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ ইকবাল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছে।