
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। আর এই মহররম মাসের ১০ তারিখ, যা “আশুরা” নামে পরিচিত, মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং এটি ইতিহাস, ত্যাগ, ধৈর্য ও ঈমানের এক অনন্য প্রতীক।
প্রথমত, আশুরার দিনটি বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, এই দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী হযরত মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ফেরাউন ছিল অত্যাচারী শাসক, যে নিজেকে খোদা বলে দাবি করত। কিন্তু আল্লাহর রহমতে মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নীলনদের উপর দিয়ে নিরাপদে পার হয়ে যান এবং ফেরাউন ও তার সৈন্যদল পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়। এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয়—অত্যাচার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে তা টিকে থাকতে পারে না।
এই কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিনে রোজা রাখার গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমি আশা করি, আশুরার রোজা রাখলে আল্লাহ তায়ালা আগের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” তাই এই দিনে রোজা রাখা সুন্নত এবং এটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল।
তবে আশুরার সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো কারবালার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। হিজরি ৬১ সালে, এই আশুরার দিনেই ইমাম হোসাইন (রা.), যিনি ছিলেন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে শহীদ হন। তিনি ইয়াজিদের অবৈধ শাসন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকেন।
কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গী, এমনকি তাঁর পরিবার-পরিজনকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের উপর পানি পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবুও তারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। এই ঘটনা শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংগ্রাম।
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর এই আত্মত্যাগ আমাদের শেখায়—ন্যায়ের পথে থাকতে হলে কখনো কখনো জীবনও উৎসর্গ করতে হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যের বিজয় চিরন্তন, আর মিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামকে নতুন করে শক্তিশালী করেছে এবং মুসলিম উম্মাহকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা জুগিয়েছে।
আশুরার দিনটি তাই একদিকে যেমন আনন্দের—কারণ এটি আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে এটি গভীর শোকের—কারণ কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়। এই দুই অনুভূতির সমন্বয়েই আশুরা একটি অনন্য দিন।
এই দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। আশুরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা কি সত্যের পথে আছি? আমরা কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি? আমরা কি আমাদের ঈমানকে দৃঢ় রাখতে পারছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নেওয়ার জন্য আশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
সবশেষে বলা যায়, মহররমের ১০ তারিখ বা আশুরা আমাদের জন্য শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের জন্য একটি দিকনির্দেশনা। এটি আমাদের শেখায় ধৈর্য, ত্যাগ, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে। আসুন, আমরা এই পবিত্র দিনের শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করি এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার অঙ্গীকার করি।
আশুরার এই মহিমান্বিত বার্তা যেন আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ীভাবে স্থান পায়—এই কামনাই করি। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে ইসলামের সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন