
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনীতিতে কেউ উত্তরাধিকার নিয়ে আসেন, কেউ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণ করেন। আবার এমনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ব্যক্তিগত বেদনা একসময় পরিণত হয় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায়। আলহাজ মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন তেমনই এক রাজনীতিক।
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির এই আলোচিত নেতা ছিলেন একাধারে সংগঠক, দক্ষ সমন্বয়ক এবং দলের দুঃসময়ের নির্ভরযোগ্য মুখ। জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মী—সব পর্যায়েই ছিল তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি “নাসিম ভাই” নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি পরিচিত ছিলেন স্পষ্টভাষিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য।
২০২০ সালের ১৩ জুন তাঁর মৃত্যুতে শেষ হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও ভূমিকা এখনও নানা আলোচনায় ফিরে আসে।
১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর পিতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ছিলেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে সংঘটিত জেলহত্যাকাণ্ডে পিতাকে হারান তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেই নির্মম ঘটনা তাঁর ব্যক্তিজীবন ও রাজনৈতিক চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যে বয়সে একজন সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় পিতার সান্নিধ্য, সে বয়সেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন ইতিহাসের এক নৃশংস অধ্যায়।
পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা মোহাম্মদ নাসিম পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সময়ের পরিক্রমায় তিনি দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। সংগঠনের প্রতি আনুগত্য, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তাঁকে নেতৃত্বের আস্থাভাজনে পরিণত করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রশাসনিক চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেই তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
পরবর্তীতে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে একই সময়ে চিকিৎসক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও সমালোচনা ছিল। ফলে তাঁর দায়িত্বকাল ছিল অর্জন ও বিতর্ক—উভয়েরই সাক্ষী।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক হিসেবে মোহাম্মদ নাসিমের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জোটের শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য নিরসন, রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং সংকটময় সময়ে অবস্থান স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে তাঁকে প্রায়ই সামনে দেখা গেছে। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি সংলাপ ও রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখার পক্ষে ছিলেন।
জাতীয় রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকলেও নিজের নির্বাচনী এলাকা কাজীপুরের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও শিথিল করেননি তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া, সাংগঠনিক বিষয়ে মতামত দেওয়া এবং তৃণমূলকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে কর্মীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আপনজন।
রাজনীতির আনুষ্ঠানিক পরিসরের বাইরেও মানুষের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলার এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
২০২০ সালের ১ জুন হৃদ্রোগজনিত জটিলতায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি হন মোহাম্মদ নাসিম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ সময় লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১৩ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন।
চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে মোহাম্মদ নাসিম যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন দলের দুঃসময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর; সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন দৃঢ় এবং কখনও কখনও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধি। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীবান্ধব মনোভাব এবং সক্রিয় রাজনৈতিক উপস্থিতির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি একই সঙ্গে ইতিহাসের উত্তরসূরি এবং নিজের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ক্ষমতার করিডোর থেকে তৃণমূলের মানুষের কাছাকাছি থাকা এই রাজনীতিকের জীবন মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি শুধু ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি বিশ্বাস, সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা এবং সংকটের সময়ে দায়িত্ব পালনেরও নাম।
তাঁর প্রস্থান তাই শুধু একজন প্রবীণ নেতার মৃত্যু নয়; বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অভিজ্ঞ, প্রভাবশালী এবং বহুমাত্রিক অধ্যায়ের অবসান।
লেখক : প্রদীপ চন্দ্র মম, কবি ও সাংবাদিক।