
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের সম্মানিত স্পিকার মহোদয় যদি এমন মন্তব্য করে থাকেন যে, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশই চোর”, তাহলে প্রশ্নটি শুধু ওই বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি আরও গভীরে—একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন সম্পর্কে এমন কঠোর মন্তব্য উচ্চারিত হওয়ার পরও কেন সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে না?
আরও বড় প্রশ্ন—আমরা কি দুর্নীতিকে এতটাই স্বাভাবিক করে ফেলেছি যে, দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি হারালে প্রতিবাদ হয়, কিন্তু পুরো একটি শ্রেণিকে ‘চোর’ বলা হলেও আত্মমর্যাদার প্রশ্নটি সামনে আসে না?
অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত—এমন সাধারণীকরণ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। হাজারো সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যারা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু দুর্নীতির বিস্তার যে রাষ্ট্রীয় সেবা, প্রশাসন ও অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ তৈরি করে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সমস্যা শুধু চোরের নয়, চুরির ব্যবস্থার
দুর্নীতি কখনো একা জন্ম নেয় না।
একজন কর্মকর্তা ঘুষ নেন—কিন্তু ঘুষের টাকা কোথায় যায়?
একটি ফাইল আটকে রাখা হয়—কেন রাখা হয়?
একটি টেন্ডার নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে যায়—কার অনুমোদনে?
একটি প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে—কারা লাভবান হয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, দুর্নীতির সঙ্গে শুধু একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়; অনেক সময় জড়িয়ে পড়ে দালাল, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার একটি বিস্তৃত বলয়।
এ কারণেই দুর্নীতিবিরোধী লড়াই শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
কারণ মানুষ বদলালেও যদি ব্যবস্থা একই থাকে, দুর্নীতির পথ বদলায় না।
রাজনীতি যখন ভাগের হিসাব বোঝে
দুর্নীতির আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্কের মধ্যে একটি অনৈতিক সমঝোতা তৈরি করতে পারে।
যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা মনে করেন, প্রশাসনকে ব্যবহার না করলে ক্ষমতার সুবিধা পাওয়া যাবে না, আর কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, রাজনৈতিক আশ্রয় ছাড়া নিজের অনৈতিক সুবিধা নিরাপদ থাকবে না—তাহলে তৈরি হয় একটি পারস্পরিক নির্ভরতার সংস্কৃতি।
সেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থ পিছনে পড়ে যায়।
সামনে চলে আসে—
কে কত পাবে,
কার ভাগ কত,
কার ফাইল আগে যাবে,
কার প্রকল্প হবে,
কার ঠিকাদারি হবে।
এখানেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নাগরিকসেবার জায়গা থেকে সুবিধা বণ্টনের যন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি হলো জনগণের অভ্যাস
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে কঠিন বাধা হয়তো দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি নয়—দুর্নীতিকে মেনে নেওয়া সামাজিক মানসিকতা।
একসময় মানুষ ঘুষ দিতে লজ্জা পেত।
এখন অনেকেই বলেন—“টাকা না দিলে কাজ হবে না।”
একসময় দালালের কাছে যেতে অপমান মনে হতো।
এখন বলা হয়—“ওকে ধরলে কাজটা দ্রুত হবে।”
একসময় অন্যায় সুবিধা নেওয়াকে অপরাধ মনে করা হতো।
এখন অনেকে বলেন—“সবাই নেয়, আমি নিলে সমস্যা কী?”
এই ‘সবাই করে’ মানসিকতাই দুর্নীতির সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়।
মানুষ যখন অন্যায়কে প্রতিরোধ না করে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে, তখন দুর্নীতি শুধু প্রশাসনের সমস্যা থাকে না—তা সমাজের অভ্যাসে পরিণত হয়।
তাহলে কি বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হতে পারবে না?
অবশ্যই পারবে—কিন্তু শুধু বক্তৃতায় নয়।
দুর্নীতি কমাতে হলে প্রথমে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
সরকারি সেবায় যত বেশি অপ্রয়োজনীয় ধাপ থাকবে, তত বেশি দুর্নীতির সুযোগ থাকবে। তাই নাগরিকসেবা যতটা সম্ভব ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প ব্যয়, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি—সব ক্ষেত্রেই জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষভাবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক প্রভাব—কোনোটিই যেন দায়মুক্তির ঢাল না হয়।
একই সঙ্গে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্র গড়তে শুধু দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিলেই হবে না; সৎ মানুষকে নিরাপদও করতে হবে।
‘চোর’ শব্দের প্রতিবাদ না হওয়ার চেয়েও ভয়ংকর হলো চুরির প্রতিবাদ না করা
কেউ একজন কঠোর ভাষায় কোনো শ্রেণির বিরুদ্ধে মন্তব্য করলেন—তার প্রতিবাদ হতে পারে, হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যেন শব্দের বিতর্কে আটকে না যাই।
মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কেন দুর্নীতি হচ্ছে?
কোথায় হচ্ছে?
কারা সুবিধা পাচ্ছে?
কেন ধরা পড়ছে না?
ধরা পড়লেও কেন বিচার শেষ হয় না?
আর কেন সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু ‘চোর’ শব্দটি নিয়ে বিতর্ক করলে মূল রোগ আড়ালেই থেকে যাবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের লড়াই সফল হবে তখনই, যখন ঘুষ নেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তেমনি ঘুষ দেওয়া, ঘুষের ব্যবস্থা করা এবং দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতাও সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
কারণ দুর্নীতি কোনো একক পেশার সমস্যা নয়। এটি একটি ব্যবস্থার অসুখ।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো—যেদিন মানুষ অসুস্থ ব্যবস্থাকে অসুখ মনে না করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নেয়, সেদিন দুর্নীতি আর অপরাধ থাকে না; সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার স্বপ্ন তাই শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলানোর স্বপ্ন নয়।
এটি হতে হবে—
রাজনীতির জবাবদিহির,
প্রশাসনের স্বচ্ছতার,
ব্যবসার নৈতিকতার,
আর জনগণের প্রতিবাদী বিবেক ফিরিয়ে আনার আন্দোলন।
নইলে আজ আমরা বলব—“ওরা চোর।”
কাল অন্য কেউ বলবে—“ওরা চোর।”
আর পরশু আমরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকব।
কারণ তখন চোর বদলাবে,
ক্ষমতা বদলাবে,
সরকার বদলাবে—
কিন্তু চুরির ব্যবস্থা বদলাবে না।
কলমে: আল আমিন মিলু
লেখক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক | গবেষক | সরিষাবাড়ী, জামালপুর