মাদকসহ আটক, কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্ত! আইনের দুর্বলতা নাকি প্রয়োগের ঘাটতি?


নিজস্ব প্রতিবেদক
মাদক আমাদের সমাজের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। একটি পরিবার, একটি সমাজ এমনকি একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মাদকই যথেষ্ট। মাদকের ভয়াল থাবায় প্রতিনিয়ত বিপথগামী হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ। অথচ মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও বাস্তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, মাদকসহ পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলেও মাত্র তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে। এরপর আবারও সেই পুরোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাহলে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের কোথায় দুর্বলতা? কেন মাদকসহ আটক হওয়ার পরও অপরাধীরা এত সহজে জামিনে মুক্তি পাচ্ছে? অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারিদের আটক করছে। উদ্ধার করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। দায়ের করা হচ্ছে নিয়মিত মামলা। কিন্তু আটকের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জামিনে বেরিয়ে আসায় পুলিশের অভিযান অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনছে না।
এতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রচেষ্টাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে হতাশা। অনেকেই মনে করছেন, আটক হওয়ার পর যদি কয়েক দিনের মধ্যেই অপরাধীরা আবার বাইরে চলে আসে, তাহলে মাদক নির্মূলে স্থায়ী সমাধান আসবে কীভাবে?
তবে মনে রাখতে হবে, জামিন পাওয়া মানেই কেউ নিরপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। আদালত প্রচলিত আইন, মামলার নথি, প্রমাণ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করেই জামিনের সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। তাই শুধু জামিনের বিষয়টিকে দায়ী না করে মামলার তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং আইনের প্রয়োগে কোথাও কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের মতে, মাদক নির্মূলে শুধু লোকদেখানো অভিযান কিংবা মাঝেমধ্যে আটক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত হোতা, অর্থের জোগানদাতা এবং নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত যেন নির্ভুল ও শক্তিশালী হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ, অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
সচেতন মহলের দাবি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মাদক অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ আজকের তরুণ সমাজই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের রক্ষা করতে না পারলে এর দায় পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে চাই কার্যকর আইন, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতকরণ।
আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।








