মন খারাপ – আল আমিন মিলু

শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
শেয়ার করুন:

নিজস্ব প্রতিবেদক 

এখন আর মন খারাপ হলে কেউ জানতে চায় না, কেউ নীরবতার ভাঁজ খুলে খুঁজে দেখে না কোথায় জমেছে অভিমানের কালো মেঘ, কোন অদৃশ্য ক্ষত থেকে ঝরছে বিষণ্নতার বৃষ্টি।

কেউ আর হঠাৎ করে বলে না— কী হয়েছে তোমার? চোখের তারায় এত বিষাদের ছায়া কেন? কণ্ঠের ভেতর এমন শীতের হাহাকার কেন? এমনকি মিথ্যে সান্ত্বনার দুটো শব্দও আজকাল বড্ড দুর্লভ হয়ে গেছে।

তাই মন খারাপ হলে এখন আমি একাকিত্বের কাছে আশ্রয় খুঁজি। নির্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি, নদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া স্রোত দেখি। মনে হয়, ওরাও বুঝি আমার মতো— বুকের গভীরে কত ভাঙনের শব্দ নিয়ে বাইরে থেকে কী নিদারুণ শান্ত!

আকাশের মেঘেরা কাউকে বলে না কতটা ভারী তাদের বুক, শুধু একদিন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। নদী কাউকে শোনায় না তার ক্ষয়ের গল্প, শুধু দুই তীরের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে অবিরাম ছুটে চলে অজানার দিকে।

আমিও এখন বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ি নিজেরই নির্জনতার উঠোনে, কাউকে না জানিয়ে চোখের জল মুছে আবার মানুষের ভিড়ে ফিরে যাই। মুখে হাসির রোদ মেখে রাখি, অথচ ভেতরে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে।

একসময় ভাবতাম, মানুষের মন বুঝি মানুষেরই আশ্রয়, একটু অভিমান করলে কেউ না কেউ ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেবে। এখন বুঝি, সব দরজায় কড়া নাড়তে নেই, সব মানুষ হৃদয়ের ভাষা পড়তে জানে না, কেউ কেউ শুধু প্রয়োজনের অভিধান বোঝে।

তবু মাঝরাতে খুব জানতে ইচ্ছে করে— মানুষ কি সত্যিই এতটা বদলে যায়? নাকি আমাদের দুঃখগুলোই একসময় অন্যের কাছে পুরোনো খবর হয়ে যায়? যে মানুষ একদিন চোখ দেখেই বুঝত বিষাদ, সে আজ পাশে থেকেও কেন অচেনা?

এখন আর মন খারাপ হলে কাউকে ডাকি না, অভিমানের চিঠি লিখে পাঠাই না কারও ঠিকানায়। শুধু আকাশের কাছে কিছু না-বলা কথা রেখে আসি, নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিই জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

কারণ শিখে গেছি— সব কান্নার জন্য কাঁধ মেলে না পৃথিবী, সব নীরবতার অনুবাদ হয় না মানুষের কাছে। কিছু কষ্ট নিজের ছায়ার মতোই আজীবন নিজের সঙ্গে বয়ে বেড়াতে হয়।

তাই মন খারাপ হলে আজকাল আমি আকাশ দেখি, নদী দেখি— আর নিজেকেই নিজের সান্ত্বনা দিই। যে জীবনে খোঁজ নেওয়ার মানুষ নেই, সেখানে একাকিত্বই হোক শেষ আশ্রয়; নদীর মতো বয়ে যাই নীরবে, কোনো তীরের কাছে থামার প্রত্যাশা ছাড়াই।

— লেখক, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সরিষাবাড়ী, জামালপুর।