
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা, আজ পবিত্র জুমার দিন। একজন মুমিনের জীবনে শুক্রবার শুধু সপ্তাহের একটি দিন নয়; এটি আল্লাহর রহমত, বরকত, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ। তাই আসুন, আমরা জেনে নিই—ইসলামের দৃষ্টিতে শুক্রবারকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই পবিত্র দিনে আমাদের করণীয় কী।
ইসলামে শুক্রবার বা জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, “সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।” এই দিনে হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। কিয়ামতও জুমার দিনেই সংঘটিত হবে—এমন বর্ণনাও হাদিসে এসেছে।
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যখন জুমার নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দাও। অর্থাৎ দুনিয়ার ব্যস্ততার চেয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়াই একজন মুমিনের কাছে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
জুমার দিন আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধিরও একটি বড় সুযোগ। মানুষ প্রতিদিন নানা ভুল-ত্রুটি ও গুনাহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। কখনো জেনে, কখনো না জেনে আমরা অন্যের অধিকার নষ্ট করি, মিথ্যা বলি, গীবত করি, অহংকার করি কিংবা চোখ, কান ও জিহ্বার মাধ্যমে এমন কাজ করি যা আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই শুক্রবার আমাদেরকে নিজের জীবনকে পর্যালোচনা করার শিক্ষা দেয়।
এই দিনে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। বান্দা আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে এলে আল্লাহ তার জন্য ক্ষমার দরজা খুলে দেন। তবে শুধু মুখে ক্ষমা চাইলেই হবে না; গুনাহ থেকে ফিরে আসার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে এবং কারও হক নষ্ট করে থাকলে তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে।
জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো দরুদ শরিফ বেশি বেশি পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। তাই শুক্রবারে আমাদের জিহ্বা যেন অপ্রয়োজনীয় কথার পরিবর্তে দরুদ, জিকির, ইস্তিগফার ও কোরআন তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকে।
এছাড়া জুমার দিনে সূরা কাহফ পাঠের বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত করা, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের জীবনে কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা উচিত।
জুমার দিনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয়গুলোর একটি হলো—এই দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন। সেই বিশেষ সময়টি কখন—এ বিষয়ে আলেমদের বিভিন্ন মত রয়েছে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা না করে পুরো দিনটিই দোয়া, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণে কাটানোর চেষ্টা করা উচিত।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, জুমা শুধু মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের নাম নয়। জুমা হলো নিজের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার দিন, গুনাহ থেকে ফিরে আসার দিন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার দিন। একজন মুমিনের উচিত জুমার শিক্ষা শুধু মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা সপ্তাহের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
আজ আমরা নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করি—আমি কি আল্লাহর জন্য সত্যিই পরিবর্তিত হতে চাই? আমার জীবনে এমন কোনো গুনাহ আছে কি, যা আমি বারবার করছি? কারও প্রতি অন্যায় করেছি কি? কারও মনে কষ্ট দিয়েছি কি? কারও হক নষ্ট করেছি কি?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ আল্লাহর রহমতের দরজা এখনও খোলা। আজকের এই পবিত্র শুক্রবার হতে পারে আমাদের জীবনের নতুন শুরুর দিন।
আসুন, আমরা সবাই আন্তরিকভাবে তওবা করি। নামাজ কায়েম করি, কোরআন পড়ি, দরুদ ও ইস্তিগফার করি, গীবত-মিথ্যা-অন্যায় থেকে নিজেদের দূরে রাখি এবং মানুষের হক আদায় করি।
হে আল্লাহ, পবিত্র জুমার উসিলায় আমাদের জানা-অজানা সব গুনাহ ক্ষমা করুন। আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, ঈমানকে মজবুত করুন, হালাল রিজিক দান করুন এবং আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশকে শান্তিতে ভরিয়ে দিন।
হে দয়াময় আল্লাহ, আমরা যারা ভুল-ত্রুটিতে ভরা মানুষ, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের জীবনের শেষ পরিণতি ঈমানের সঙ্গে করুন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
সবাইকে জানাই পবিত্র জুমার দিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা—জুমা মোবারক। জুম্মা মোবারক।