
নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক সূচকের ঊর্ধ্বগতিতে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে—সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, কতটা স্বস্তিতে এবং কতটা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে পারছে তার ওপর। যখন একজন নাগরিক প্রতিদিনের জীবনে অনিশ্চয়তা, ব্যয়বৃদ্ধি এবং বিচার পাওয়ার আশা নিয়ে সংগ্রাম করে, তখন উন্নয়নের গল্পের পাশাপাশি তার বাস্তবতার গল্পও শোনা জরুরি।
দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের নীরব ঘাতক। এটি শুধু অর্থ অপচয় করে না; মানুষের বিশ্বাসও ক্ষয় করে। যেখানে নিয়মের চেয়ে প্রভাব, সততার চেয়ে অনিয়ম এবং যোগ্যতার চেয়ে সুপারিশ বেশি কার্যকর বলে মনে হয়, সেখানে সুশাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেবল শাস্তির বিষয় নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।
একইভাবে, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং বিচার যথাসময়ে ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, তখন সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ে। অন্যদিকে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া বা ন্যায়বিচার নিয়ে হতাশা তৈরি হলে সামাজিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিচারব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা সময়ের দাবি।
অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলে। একটি পরিবারের মাসিক আয় যদি অপরিবর্তিত থাকে অথচ খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে তাদের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ভ্যাট ও করের বোঝা বাড়লে সেই চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। রাজস্ব আহরণ রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে নীতি প্রণয়নের সময় জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও স্বচ্ছতা মানুষের আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাজার—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সময়োপযোগী, তথ্যভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি কার্যকর প্রশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে। একজন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন, একজন শ্রমিক মর্যাদাপূর্ণ মজুরি পাবেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্থিতিশীল বাজার পাবেন এবং একজন তরুণ তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ পাবেন—এই প্রত্যাশাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ। তবে সমালোচনার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান খোঁজা, বিভাজন সৃষ্টি করা নয়। দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর তদারকি, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব পদক্ষেপ একটি আরও শক্তিশালী ও আস্থাশীল রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র কি কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে শক্তিশালী হবে, নাকি মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করেও শক্তিশালী হবে? ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্র মানুষের কথা শোনে, মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয় এবং আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। তাই মানুষের আস্থা রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্থনৈতিক নীতিতে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর