
নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি ট্রেনের রুট পরিবর্তন অনেকের কাছে হয়তো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মাত্র। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব পড়ে হাজারো মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ওপর। তাই জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি জামালপুর-সরিষাবাড়ি-তারাকান্দি-যমুনা সেতু পূর্ব স্টেশন হয়ে ঢাকা রুটে না চালিয়ে দেওয়ানগঞ্জ রুটে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্তের ফলে লাভবান হলো কে? আর বঞ্চিত হলো কারা?
দীর্ঘদিন ধরে সরিষাবাড়ি ও তারাকান্দি অঞ্চলের মানুষ এই রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচলের দাবি জানিয়ে আসছেন। এই অঞ্চলের মানুষ কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত ঢাকামুখী যাতায়াত করেন। অথচ তাদের যৌক্তিক দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে। জনগণ তাদের ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন এই আশায় যে, তারা এলাকার ন্যায্য দাবি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরবেন। কিন্তু জামালপুর এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মনে একটি ধারণা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে—তাদের দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক চাপ কিংবা কার্যকর উদ্যোগ কোথাও দেখা যায়নি।
রাজনীতির মূল শক্তি জনগণ। অথচ যখন জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ প্রশ্ন করে—আমাদের প্রতিনিধি আসলে কার প্রতিনিধিত্ব করছেন?
এ অঞ্চলের মানুষ উন্নয়নের নামে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। নির্বাচনের সময় উন্নয়নের ফিরিস্তি, নতুন নতুন প্রকল্পের ঘোষণা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের অঙ্গীকার—সবই ছিল। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মানুষ আজ দেখছে, তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। উন্নয়নের ভাষণ যত উঁচু হয়েছে, ততই সাধারণ মানুষের ন্যায্য দাবিগুলো যেন আড়ালে পড়ে গেছে।
গণতন্ত্রে জনগণের মতামতই চূড়ান্ত শক্তি। তাই জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনোই টেকসই হতে পারে না। একটি অঞ্চলের মানুষ যদি মনে করে তাদের সঙ্গে অবিচার হয়েছে, তাহলে সেই ক্ষোভ একদিন না একদিন রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত হবেই।
আজ প্রয়োজন দায় এড়িয়ে যাওয়ার নয়, বরং জনগণের সামনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার। কেন এই রুটে ট্রেন দেওয়া হলো না? কোন বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন? জনগণ এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চায়।
জামালপুর এক্সপ্রেস কেবল একটি ট্রেন নয়; এটি একটি অঞ্চলের যোগাযোগের স্বপ্ন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সেই স্বপ্ন যদি বারবার উপেক্ষিত হয়, তাহলে হতাশা জন্ম নেবে—এটাই স্বাভাবিক।
জনগণ এখনো আশা করে, তাদের ন্যায্য দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ উন্নয়ন তখনই সফল হয়, যখন তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ; কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সুবিধা নয়।
আল আমিন মিলু
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক কলামিস্ট
সরিষাবাড়ি জামালপুর