যমুনায় ১৫ দিন পর উৎপাদন শুরু, এক–দুই দিনের মধ্যেই আবার বন্ধের শঙ্কা | প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করতে পারছে না তিতাস


নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে, বয়লারের ত্রুটিও মেরামত করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে আবারও ইউরিয়া উৎপাদন শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল)। কিন্তু উৎপাদন শুরুর আনন্দ স্থায়ী হওয়ার আগেই দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা। প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আবারও উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পরও কেন স্থিতিশীল উৎপাদনে ফিরতে পারছে না দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সার কারখানা? গ্যাস সরবরাহ করেও প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন চালুর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে?
যমুনা সা কারখানার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রসায়ন) মো. ফজলুল হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ৪২ থেকে ৪৩ এমএমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন। অথচ প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের পরও ইউরিয়া উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। তিনি আরও বলেন, গ্যাসের চাপ সংকটের বোঝা মাথায় নিয়ে শুক্রবার সকাল ১০ টার দিকে কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেও গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় সরবরাহ না করা হলে আগামী ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে ফের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উৎপাদন শুরু, ৪৮ ঘণ্টায় ফের বিপর্যয় :
গ্যাসসংকটের কারণে ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বন্ধ হয়ে যায় যমুনা সার কারখানার উৎপাদন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড গ্যাস সরবরাহ শুরু করলেও প্রয়োজনীয় চাপ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি গ্যাসের চাপ ৮ কেজিতে নেমে এলে বয়লার ‘স্ট্রিপ’ করে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ করতে হয়। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি চাপ আরও কমে ৫ দশমিক ২ কেজিতে নেমে আসে। ফলে পুরো কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আবারও গ্যাস সরবরাহ শুরু করে তিতাস। ৬ অক্টোবর রাত ৩টা ১০ মিনিটে উৎপাদনে ফেরে কারখানাটি। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনও স্থায়ী হয়নি। উৎপাদন শুরুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ ৮ অক্টোবর বয়লারে লিকেজ দেখা দিলে আবারও বন্ধ হয়ে যায় ইউরিয়া উৎপাদন।
অবশেষে বয়লারের লিকেজ মেরামত করে ১৫ দিন পর শুক্রবার সকালে উৎপাদন শুরু হয়েছে। কিন্তু এবারও সামনে গ্যাসের চাপসংকট। অর্থাৎ, উৎপাদন চালুর পরও কারখানাটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কতক্ষণ উৎপাদন চালু রাখা যাবে?
ত্রুটি মেরামত, কিন্তু মূল সংকটের সমাধান কোথায়? : কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করা হয়েছে। অ্যামোনিয়া উৎপাদনও চালু রয়েছে। কিন্তু গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় ইউরিয়া উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। চাপ বাড়লেই ইউরিয়া উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে।
এখানেই সংকটের মূল বিষয়টি স্পষ্ট। যন্ত্রপাতি মেরামত করে উৎপাদন চালু করা গেলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা না গেলে সেই উদ্যোগ কতক্ষণ টিকবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়া শুধু কারখানার কার্যক্রমকেই অনিশ্চিত করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
দায় কার, জবাবদিহি কোথায়? : ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া উৎপাদন বিপর্যয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ, সেপ্টেম্বরে গ্যাস ফিরে পাওয়া, অক্টোবরে উৎপাদন শুরু—এরপর বয়লারের লিকেজ এবং ফের উৎপাদন বন্ধ। সব মিলিয়ে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম যেন বারবার শুরু ও থেমে যাওয়ার চক্রে আটকে আছে।
এখন শুক্রবার সকালে উৎপাদন শুরু হলেও আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। অথচ নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ৪২ থেকে ৪৩ এমএমসিএফ গ্যাস প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন কারখানার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রসায়ন) মো. ফজলুল হক।
তাই প্রশ্ন শুধু উৎপাদন শুরু হয়েছে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তারা তা নিশ্চিত করতে পারছেন না কেন? বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন? আর কতবার উৎপাদন চালু ও বন্ধের এই অনিশ্চয়তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
যমুনা সার কারখানায় উৎপাদন চালু হওয়া একটি খবর; কিন্তু উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে না পারা আরও বড় সংকট। গ্যাসের সংযোগ ফিরলেই দায়িত্ব শেষ হয় না—প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করে উৎপাদন সচল রাখার নিশ্চয়তাও দিতে হয়। সেই নিশ্চয়তা না মিললে উৎপাদন শুরুর প্রতিটি ঘোষণাই শেষ পর্যন্ত নতুন করে বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার সামনে দাঁড়াবে।








