
নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। আর সেই জনগণ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকে, তখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়—এটি একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকেত।
আজ সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে হিসাব মেলাতে পারছেন না। আয় বাড়ার তুলনায় যদি ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে একজন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাপন কতটা কঠিন হয়ে পড়ে, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া কিংবা যাতায়াত—সবকিছু মিলিয়ে অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষে চলতে হচ্ছে।
কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট শুধু অভাব নয়; মানুষের কষ্ট হলো—ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
রাজনীতিতে যখন মানুষের স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতির মাঝে মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
নির্বাচনের সময় আমরা শুনি নানা প্রতিশ্রুতি। বলা হয়—কর্মসংস্থান হবে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে, দুর্নীতি বন্ধ হবে, মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে পরিণত হয়?
কারণ মিথ্যা কথায় চিড়া ভিজে না।
মানুষকে শুধু আশ্বাস দিয়ে বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রয়োজন খাবার, বেকারের প্রয়োজন কাজ, অসুস্থ মানুষের প্রয়োজন চিকিৎসা, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজন নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন।
আজ দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। শিক্ষাজীবন শেষ করে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, আবার কেউ হতাশ হয়ে পড়ছেন। একটি দেশের তরুণরা যদি নিজেদের দেশেই ভবিষ্যৎ দেখতে না পান, তাহলে সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়।
এদিকে রাজনীতিতে বিভাজন যত বাড়ে, সমাজেও তার প্রভাব পড়ে। মানুষ দল ও মতের কারণে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। অথচ একটি রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং পরস্পরের মতামতের প্রতি সম্মান।
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ। ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতা কীভাবে জনগণের জন্য ব্যবহার করা হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও সততা হবে মানুষের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। যেখানে ব্যবসায়ী নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারবেন, কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন, শ্রমিক তার শ্রমের সম্মানজনক পারিশ্রমিক পাবেন এবং তরুণরা নিজের দেশে কাজের সুযোগ পাবেন।
দেশের মানুষ এখন বড় বড় কথা নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা চায় বাজারে স্বস্তি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—ক্ষমতার লড়াই কমিয়ে জনগণের সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিন।
কারণ মানুষ কোনো দলের শত্রু নয়। মানুষ এই দেশের নাগরিক। তাদের ভোটে সরকার আসে, তাদের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং তাদের শ্রমেই দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যায়।
সুতরাং এখন সময় এসেছে রাজনীতির ভাষা বদলানোর। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিকল্পনা দরকার। পরস্পরকে দোষারোপ নয়, সমস্যার সমাধান দরকার। বিভাজন নয়, ঐক্য দরকার।
মনে রাখতে হবে—একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনীতিবিদদের হাতে নয়; ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি জনগণের সচেতনতার ওপর।
আজ মানুষ দিশেহারা—এই বাস্তবতা অস্বীকার না করে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কোন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই আগামী প্রজন্মের জন্য?
মিথ্যা কথায় হয়তো কিছু সময়ের জন্য মানুষকে আশ্বস্ত করা যায়, কিন্তু বাস্তব সংকটের সমাধান করা যায় না।
তাই এখন প্রয়োজন কথার রাজনীতি নয়—কাজের রাজনীতি। প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়—জবাবদিহিতার রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতি নয়—জনগণের কল্যাণের রাজনীতি।
এটাই হতে পারে একটি সুন্দর, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথ।