
নিজস্ব প্রতিবেদক
মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা সাংবাদিকতার সামনে নতুন দরজা খুলেছে। মুঠোফোন এখন ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, নিউজরুম এবং সম্প্রচারমাধ্যম—সবকিছুর কাজ করতে পারে। একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ঘটনা মুহূর্তেই পৌঁছে যেতে পারে লাখো মানুষের কাছে। দুর্নীতির দৃশ্য, অনিয়মের প্রমাণ কিংবা মানুষের বঞ্চনার ছবি দ্রুত জনসমক্ষে আসতে পারে।
এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিকতার জন্য বড় সম্ভাবনা।
কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে একটি বিপদও এসেছে—সংবাদ কি ধীরে ধীরে ‘কনটেন্টে’ পরিণত হচ্ছে?
আমার কাছে এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।
কারণ সাংবাদিকতার মূল শক্তি কখনো ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরা ছিল কেবল একটি হাতিয়ার। সাংবাদিকতার আসল শক্তি ছিল—তথ্য যাচাই, অনুসন্ধান, প্রেক্ষাপট, জনস্বার্থ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। সেই জায়গাগুলো যদি হারিয়ে যায়, হাতে যত আধুনিক ক্যামেরাই থাকুক, সাংবাদিকতা শক্তিশালী হবে না; বরং শুধু কনটেন্ট উৎপাদনের গতি বাড়বে।
ডিজিটাল সাংবাদিকতায় ভিউ গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের পাঠক-দর্শক দরকার। বিজ্ঞাপন দরকার। অর্থনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্নও আছে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভিউ সংবাদ নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে একজন আহত মানুষ পড়ে আছেন। একজন স্বজন কাঁদছেন। কেউ আতঙ্কে কথা বলতে পারছেন না। ক্যামেরা এগিয়ে গেল। ‘কেমন লাগছে?’ ‘আপনার অনুভূতি কী?’ ‘শেষবার কখন কথা হয়েছিল?’
ভিডিও তৈরি হলো। তারপর আবেগঘন সংগীত বড় অক্ষরের ক্যাপশন। নাটকীয় উপস্থাপনা। আর ভিউ।
এখানে আমার প্রশ্ন—আমরা কি সংবাদ সংগ্রহ করছি, নাকি মানুষের দুর্বল মুহূর্ত সংগ্রহ করছি?
একজন মানুষের কান্না দর্শককে আবেগী করতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকের কাজ দর্শককে শুধু আবেগী করা নয়; তাকে সত্য জানানো। এই পার্থক্যটি যতদিন পরিষ্কার থাকবে, ততদিন সাংবাদিকতা সাংবাদিকতাই থাকবে।
কেউ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। কেউ স্বজন হারিয়েছেন। কোনো শিশু আতঙ্কে কাঁদছে। কোনো পরিবার হঠাৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এসব মুহূর্ত মানুষের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও ভঙ্গুর সময়। সেই সময় ক্যামেরা সামনে ধরার আগে একজন সাংবাদিকের নিজের কাছে অন্তত একটি প্রশ্ন করা উচিত—
‘আমি কি সত্যিই জনস্বার্থে এই মুহূর্তটি ধারণ করছি, নাকি দর্শকের কৌতূহর মেটাতে?’ কারণ জনস্বার্থ আর জনকৌতূহল এক জিনিস নয়। মানুষ দেখতে চায়—এটি সত্য। কিন্তু মানুষ দেখতে চায় বলেই সাংবাদিককে সবকিছু দেখাতে হবে—এটি সত্য নয়। সাংবাদিকতার কাজ মানুষের কৌতূহলকে তৃপ্ত করা নয়; বরং সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় সত্য সামনে আনা।
আমার কাছে একজন সাংবাদিকের দক্ষতার অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো—তিনি কখন ক্যামেরা বন্ধ করবেন, সেটি জানেন কি না। একজন স্বজনহারা মানুষ কাঁদছেন। একটি শিশু ভয় পেয়েছে। একজন আহত ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। কোনো পরিবার ব্যক্তিগত সংকটে ভেঙে পড়েছে। সেই মুহূর্তে ক্যামেরা বন্ধ করা কখনো সংবাদবিরোধী সিদ্ধান্ত নয়। বরং সেটিই হতে পারে সাংবাদিকতার সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত। কারণ সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে প্রদর্শনীতে পরিণত করা নয়। সংবাদ মানুষের জন্য; মানুষ সংবাদপণ্যের কাঁচামাল নয়।
এই একটি বাক্য যদি সাংবাদিকতার মাঠে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অনেক অনৈতিক কনটেন্ট নিজে থেকেই তৈরি হবে না।
স্মার্টফোন সাংবাদিকতা সহজ করেছে, সাংবাদিক হওয়া নয় আজ একটি মুঠোফোন হাতে নিলেই কেউ ভিডিও ধারণ করতে পারেন। এটি ভালো।কিন্তু ভিডিও ধারণ করা আর সাংবাদিকতা করা এক নয়।
ক্যামেরা জানে না কোন তথ্য যাচাই করা দরকার।
মাইক্রোফোন জানে না কোন প্রশ্ন একজন বিপর্যস্ত মানুষকে করা উচিত নয়। মুঠোফোন জানে না কোনো ছবি প্রকাশ করলে একটি পরিবারের সামাজিক বা ব্যক্তিগত ক্ষতি হতে পারে। এসব বুঝতে লাগে পেশাগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিবেক।
তাই সাংবাদিকতার প্রবেশদ্বার প্রযুক্তি সহজ করেছে—এটি স্বাগত জানানোর মতো পরিবর্তন।
কিন্তু প্রযুক্তি সহজ হয়েছে বলে পেশাদারিত্বও সহজ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ভয়ংকর।
আরেকটি জায়গায় আমার আপত্তি আরও বেশি।
সাংবাদিকের কাজ হলো সংবাদকে সামনে আনা।
কিন্তু যখন প্রতিবেদক নিজেই প্রতিবেদনের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠেন, তখন সাংবাদিকতার চরিত্র বদলাতে শুরু করে। ঘটনার চেয়ে প্রতিবেদকের উপস্থিতি বড়। তথ্যের চেয়ে তাঁর অভিনয়ধর্মী উপস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নের চেয়ে তাঁর অঙ্গভঙ্গি বেশি দৃশ্যমান। তখন সংবাদ আর সংবাদ থাকে না।
তা হয়ে ওঠে পারফরম্যান্স। অবশ্যই একজন সাংবাদিকের নিজস্ব উপস্থাপনা থাকতে পারে। কিন্তু সেই উপস্থাপনা যদি তথ্যকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— আমরা সংবাদ দেখছি, নাকি একজন ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের পারফরম্যান্স দেখছি?
আমরা প্রায়ই বলি, ভুয়া তথ্য সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক। নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার মতে, অর্ধসত্যও সমান বিপজ্জনক। একটি ভিডিও সত্য হতে পারে। কিন্তু তার ব্যাখ্যা ভুল হতে পারে। একটি বক্তব্য সত্য হতে পারে। কিন্তু তার আগের-পেছনের প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হতে পারে। একটি ঘটনা সত্য হতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য না থাকায় পুরো সংবাদটি অসম্পূর্ণ হতে পারে ডিজিটাল সাংবাদিকতার দ্রুতগতিতে এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সংবাদ মানেই ভালো সংবাদ নয়। কখনো কখনো একটু দেরিতে প্রকাশিত যাচাইকৃত সংবাদই অনেক বেশি মূল্যবান।
একজন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিককে সব দায় দিয়ে দিলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়ালে থেকে যাবে।
প্রশ্ন করতে হবে সংবাদমাধ্যমকেও। একজন প্রতিবেদককে কত সময় দেওয়া হচ্ছে? তাঁর কাছ থেকে দিনে কয়টি ভিডিও চাওয়া হচ্ছে? তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ কতটা? সম্পাদকীয় সহযোগিতা আছে কি? নৈতিক সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ আছে কি? নাকি প্রতিষ্ঠানের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
আজ কতটি কনটেন্ট গেল এবং কত ভিউ হলো?
যদি সংবাদকর্মীর সাফল্যের মাপকাঠি ক্রমেই ভিউ, রিচ ও পোস্টের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে একসময় তিনি স্বাভাবিকভাবেই সেই জিনিস তৈরি করবেন যা বেশি দেখা হয়।
প্রযুক্তিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমি মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার বিরোধী নই।
বরং এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাগুলোকে