
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরিষাবাড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পোগলদিঘা ডোয়াইল, আওনা, পিংনায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে মাদকের ভয়াবহতা। দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের আঁধার নামলেই যেন সক্রিয় হয়ে উঠছে মাদক কারবারিরা। নিরিবিলি সড়ক, অন্ধকার গলি কিংবা জনবসতি থেকে কিছুটা দূরের এলাকায় গোপনে চলছে মাদক কেনাবেচা—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদকের বিস্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে মাদক কেনাবেচা চলে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অনেক সময় কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর আবারও নতুন কৌশলে শুরু হচ্ছে ব্যবসা। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান এবং আইনি পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, কুখ্যাত মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত সোহেল বর্তমানে জেলহাজতে থাকলেও তার কথিত মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং তার অনুপস্থিতিতে অন্যদের মাধ্যমে নতুন কৌশলে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—মাদকের এই বিস্তার শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে পুরো সমাজে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মাদকের সহজলভ্যতার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একজন তরুণ মাদকে আসক্ত হলে শুধু তার নিজের জীবনই ধ্বংস হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদক ব্যবসার পেছনে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। এমনকি সরকার দলীয় পরিচয় ব্যবহারকারী কিছু কথিত পাতি নেতার বিরুদ্ধে গোপনে মাদক কারবারিদের সহযোগিতা করার অভিযোগও রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব যারই থাকুক, অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ মাদক কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়—মাদক একটি সামাজিক অভিশাপ।
প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সত্যিই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের ঊর্ধ্বে? একজন মাদক কারবারির পেছনে যদি প্রভাবশালী কারও ছায়া থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা অনেক। তারা চান, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদক কারবারের মূল উৎস খুঁজে বের করা হোক। শুধু খুচরা বিক্রেতাকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; মাদকের সরবরাহকারী, অর্থের উৎস এবং পেছনের সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, রাতের বেলায় কোথায় সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। কোনো তরুণ মাদকে জড়িয়ে পড়লে তাকে ঘৃণা না করে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
সরিষাবাড়িবাসীর দাবি খুবই স্পষ্ট—তারা মাদকমুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ চান। রাতের আঁধারে যেন কোনো মাদক কারবারি নতুন কৌশলে ব্যবসা চালাতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনকে আরও কঠোর ও নিরপেক্ষ হতে হবে।
অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তের বিষয়। কিন্তু অভিযোগ যখন বারবার উঠছে, তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি। কারণ আজ যদি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী দিনে এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হতে পারে পুরো সমাজকে।
মাদক নির্মূলে দরকার রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, পরিবার ও সমাজের সচেতনতা এবং জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা। সরিষাবাড়িকে মাদকমুক্ত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। নইলে রাতের আঁধারে শুরু হওয়া এই অন্ধকার একদিন ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের ঘর, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনেও।আসুন প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করি মাদক মুক্ত সমাজ গড়ে তুলি।