
নিজস্ব প্রতিবেদক
আটেতে শৈশব—মায়ের আঁচল, বাবার হাত,
কাদামাটির ঘ্রাণ মেখে, রঙিন ছিল দিন-রাত।
বৃষ্টিভেজা উঠোনজুড়ে স্বপ্ন ছিল হাজার,
ছোট্ট দুটি চোখের ভেতর বিশাল নীল আকাশ।
ষোলোতে কৈশোর—বুকের ভেতর নতুন ঢেউ,
অচেনা এক ভালো লাগায় হারিয়ে যেত কেউ।
বন্ধুত্বে ছিল গোপন কথা, চোখে স্বপ্নের ভিড়,
চাঁদকে তখন হাত বাড়ালেই মনে হতো নিকটস্থ নীড়।
চব্বিশে যৌবন—জীবন তখন আগুনভরা গান,
স্বপ্নগুলো সত্যি করার বুকের ভেতর টান।
দুটি হাতের মুঠোয় রেখে দুটি মনের আশা,
বিবাহ নামে বাঁধা পড়ে শুরু হলো ভালোবাসা।
বত্রিশে সন্তান—ঘরে এলো নতুন ভোর,
একটি শিশুর হাসির কাছে হার মানে সব ঘোর।
তারই মুখে নিজের মুখ, তারই চোখে প্রাণ,
সন্তানের সুখের কাছে তুচ্ছ নিজের অভিমান।
চল্লিশে দায়িত্ব—কাঁধে জমে সংসারের ভার,
বাবা-মায়ের ওষুধ লাগে, সন্তানেরও দরকার।
নিজের স্বপ্ন গুটিয়ে রেখে সবার স্বপ্ন বুনি,
হাসির আড়াল চাপা দিয়ে চোখের জলের ধ্বনি।
আটচল্লিশে প্রশ্ন জাগে—সময় গেল কত?
“যাদের জন্য জীবন দিলাম, মানুষ হলো তো?”
নিজের চেয়ে সন্তানেরই ভবিষ্যৎ তখন বড়,
বুকের ভেতর দুশ্চিন্তারা করে কেবল ঘর।
ছাপ্পান্নে বিয়োগ নামে জীবনেরই খাতায়,
প্রিয় মুখের সংখ্যা কমে নীরব রাতের ব্যথায়।
বাবা নেই, মা নেই, নেই সেই শৈশবের সাথি,
স্মৃতিগুলো জেগে থাকে—মানুষগুলো মাটি।
চৌষট্টিতে অবসর—ব্যস্ত জীবন থামে,
চেনা চেয়ার অন্য কেউ নেয়, ডাক পড়ে না নামে।
যে মানুষটি সারাজীবন সবার ছিল প্রয়োজন,
তারই ঘরে নীরবতা—এ কেমন আয়োজন!
বাহাত্তরে ডাক্তারখানা, হাসপাতাল আর ওষুধ,
শরীর যেন ভাঙা নৌকা, জীবন যেন অবুঝ।
যে পা ছুটত সন্তানেরই হাতটি ধরে দূর,
সেই পায়ে আজ একটু হাঁটাও হয়ে ওঠে কঠিন সুর।
আশিতে এসে জীবন বলে—“ফেরার সময় হলো,”
স্মৃতির পাতায় হারানো মুখ একে একে এলো।
হিসাব মেলে না জীবনের, মেলে না সুখ-দুঃখ,
শুধু মনে হয়—ভালোবাসাই ছিল জীবনের মুখ।
আটের ঘরের নামতা যেন জীবনেরই গান,
আট, ষোলো, চব্বিশ পেরিয়ে ক্ষয়ে যায় প্রাণ।
সংখ্যাগুলো বাড়তে থাকে, কমে আপনজন,
শেষের দিকে মানুষ শুধু খোঁজে আপন মন।
তারপর একদিন—
থেমে যাবে ঘড়ির কাঁটা,
থেমে যাবে পথের হাঁটা,
খালি ঘরে পড়ে থাকবে
চশমা, লাঠি, পুরোনো খাতা।
কেউ হয়তো ডাকবে তখন—
“বাবা, কোথায় গেলে?”
কোনো উত্তর আসবে না আর
জীবন নদীর তীরে।
তখন বুঝবে—
জীবন মানে শুধু বছর গোনা নয়,
জীবন মানে ভালোবাসা,
হারানোর ভয়।
আটের ঘরের নামতা তাই
শেষে এসে একটাই কথা কয়—
জীবন যত দীর্ঘ হোক,
প্রিয় মানুষ ছাড়া
একটি দীর্ঘ জীবনও
কখনো পূর্ণ জীবন নয়।
— লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর