
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরিষাবাড়ীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে আবারও উন্মোচিত হয়েছে মাদক কারবারের ভয়াবহ চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া (৪৩) কে অবশেষে গ্রেফতার করেছে সরিষাবাড়ী থানা পুলিশ। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ২৩ গ্রাম হেরোইন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। এই অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে যেমন স্বস্তি এনেছে, তেমনি আবারও সামনে এসেছে মাদকবিরোধী লড়াইয়ের কঠিন বাস্তবতা।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে সরিষাবাড়ী থানার ৩নং ডোয়াইল ইউনিয়নের ঘোরার মোড় সংলগ্ন আদাচাকি এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে তাকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত বিশেষ অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে এলাকাজুড়ে সক্রিয় এই মাদক চক্রকে নিয়ন্ত্রণে আনা।
পুলিশের অপরাধ তথ্যচিত্র (CDMS) পর্যালোচনা করে জানা যায়, সোহেল মিয়া কোনো সাধারণ অপরাধী নয়; তিনি একজন কুখ্যাত পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে পূর্বেও সরিষাবাড়ী থানায় ৯টি মাদক মামলা রয়েছে। এতগুলো মামলা থাকার পরও বারবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন তুলছে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবার গ্রেফতারের পর কিছুদিন জেল হাজতে থাকার পরই অসাধু উপায়ে তিনি জামিন পেয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসৎ আইনজীবীর সহযোগিতায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দ্রুত জামিন নিশ্চিত করা হয়। ফলে আইনের ফাঁক গলিয়ে তিনি আবারও তার পুরনো মাদক ব্যবসায় ফিরে যান। এ যেন এক চক্র—গ্রেফতার, জামিন, পুনরায় অপরাধ—যা থামছেই না।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সোহেল মিয়ার রয়েছে একটি শক্তিশালী কর্মীবাহিনী, যার সংখ্যা শতাধিক। তিনি জেল হাজতে থাকলেও এই কর্মীরা তার ব্যবসা চালিয়ে যায়। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি গ্রেফতার হলেও পুরো নেটওয়ার্কটি অক্ষত থাকে। এই বাস্তবতা মাদক নির্মূলে প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সোহেল নিজেই প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন—“জজ-উকিল আমার পকেটে থাকে।” এমন দম্ভোক্তি শুধু একজন অপরাধীর সাহসই প্রকাশ করে না, বরং সমাজে আইনের প্রতি আস্থাহীনতার একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তিনি দাবি করতেন, জেলে যাওয়ার আগেই তার জামিনের ব্যবস্থা প্রস্তুত থাকে। এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান?
প্রশ্ন উঠছে, আইন কি শুধুই নিরীহ ও সাধারণ মানুষের জন্য কঠোর? আর যারা অর্থ ও প্রভাবশালী, তাদের জন্য কি আইনের দরজা সবসময় খোলা? যখন একজন কুখ্যাত মাদক কারবারি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিন পেয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা জন্ম নেয়। তারা মনে করে, আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
আমরা প্রায়ই শুনে থাকি—আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? অনেকের মতে, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তবে যেন টাকার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। সমাজে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে—“টাকা যার, আইন তার।” এই ধারণা যদি সত্যি হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
সরিষাবাড়ীর এই ঘটনা শুধু একটি গ্রেফতারের খবর নয়; এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিচ্ছবি। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, এটি ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি প্রজন্মকে। তাই মাদকবিরোধী লড়াইয়ে শুধু প্রশাসনের অভিযানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সচেতনতা এবং সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ।
এখন সময় এসেছে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার—আমরা কি সত্যিই একটি মাদকমুক্ত সমাজ চাই? যদি চাই, তবে আইনের প্রয়োগে কোনো প্রকার আপস করা চলবে না। অন্যথায়, আজকের সোহেল মিয়া কাল আরও অনেকের জন্ম দেবে, আর সমাজ ক্রমেই অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।এ বিষয়ে সরিষাবাড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ ইকবাল হাসান জানান মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যহৃত আছে। মাদক কারবারি কাউকে ছার দেওয়া হবে না।