
নিজস্ব প্রতিবেদক
মাদক—একটি শব্দ, কিন্তু এর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। আজ আমরা মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি, সভা করি, সমাবেশ করি, শপথ নিই—কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আলোচনা কি শুধুই মঞ্চে সীমাবদ্ধ? বাস্তবতায় কি আমরা কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি?
আজকের বাস্তবতা আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরছে। একদিকে মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য, ব্যানার, ফেস্টুন—অন্যদিকে গোপনে, আবার কখনো প্রকাশ্যেই চলছে মাদকের ব্যবসা। এমনকি অনেক সময় তা সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে। অথচ প্রশাসনের ভূমিকা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে, বা অনেক ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে থাকার প্রবণতা দেখা যায়।
আমরা কি তাহলে শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি? সভা-সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে কি দায়িত্ব শেষ? সমাজের মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে, আমাদের কি আর কোনো দায় নেই? এই প্রশ্নগুলো আজ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না, এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, একটি সমাজকে অস্থির করে তোলে, একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। আজকের তরুণ সমাজ—যারা আমাদের দেশের আগামীর নেতৃত্ব দেবে—তারা যখন মাদকের ছোবলে বিপথগামী হয়, তখন শুধু একটি প্রজন্ম নয়, পুরো জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু কেন এই অবস্থা? কেন এত আলোচনা, এত প্রচারণার পরেও মাদকের বিস্তার থামছে না?
প্রথমত, বাস্তবায়নের অভাব। আমরা নীতিমালা তৈরি করি, পরিকল্পনা করি, কিন্তু সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ খুবই সীমিত। আইন থাকলেও তার প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। অনেক সময় অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, আবার কখনো প্রভাবশালীদের কারণে শাস্তি এড়িয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব। আমরা অনেক সময় জানি আমাদের আশেপাশে মাদক ব্যবসা চলছে, কিন্তু ভয়ে বা উদাসীনতায় চুপ থাকি। এই নীরবতা আসলে অপরাধকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
তৃতীয়ত, সচেতনতার অভাব। তরুণদের অনেকেই মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। তারা সাময়িক আনন্দ বা বন্ধুর প্রলোভনে পা দিয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যায়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধান একদিনে আসবে না, কিন্তু শুরুটা হতে হবে এখনই। প্রথমত, প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া আইন প্রয়োগ করতে হবে। যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সমাজের প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সমালোচনা নয়, প্রতিবাদ করতে হবে, সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিতে হবে।
তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন—এইসবের মাধ্যমে তাদের ইতিবাচক পথে ব্যস্ত রাখতে হবে। যাতে তারা ভুল পথে যাওয়ার সুযোগই না পায়।
সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে—মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি সচেতন হই, প্রতিবাদ করি, এবং সঠিক পথে থাকি, তাহলে পরিবর্তন আসবেই।
তাই আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কি শুধু সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকবো, নাকি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য এগিয়ে আসবো?
সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে ঐক্য বদ্ধ হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই সুন্দর ও নতুন সম্ভাবনার দেশ গড়া সম্ভব হবে।