
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে চাইলে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শিক্ষায়। সড়ক, সেতু বা ভবন নির্মাণ একটি দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে; কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে তার শিক্ষা ব্যবস্থা। জাপান, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অগ্রগতির মূল শক্তি তাদের আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক এবং দক্ষতানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার দুর্বল সংযোগ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার অপরিহার্য।
প্রথমত, শিক্ষাকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক দায়িত্বে দলীয় পরিচয় নয়—যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়।
দ্বিতীয়ত, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতাকে শিক্ষার মূল ভিত্তি করতে হবে। পরীক্ষার নম্বর নয়, একজন শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতাই হবে তার সাফল্যের প্রধান সূচক।
তৃতীয়ত, প্রথম শ্রেণি থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, আর্থিক শিক্ষা ও পরিবেশ শিক্ষা ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে এই দক্ষতাগুলো অপরিহার্য।
চতুর্থত, নবম শ্রেণি থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।
পঞ্চমত, প্রতিটি বিদ্যালয় ও কলেজে উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং আধুনিক বিজ্ঞানাগার গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা পরিচয় (Digital Learning ID) চালু করা যেতে পারে, যাতে তার শেখার অগ্রগতি সংরক্ষিত থাকে।
ষষ্ঠত, জাপানের আদলে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা, সততা ও সামাজিক দায়িত্বকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। একটি ভালো মানুষ তৈরি না হলে কেবল ডিগ্রি জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে না।
সপ্তমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণার ফল যেন সরাসরি শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে কাজে লাগে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
অষ্টমত, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী যেন চাকরি কিংবা উদ্যোক্তা—উভয় ক্ষেত্রেই প্রস্তুত থাকে, সেই লক্ষ্যেই পাঠ্যক্রম সাজাতে হবে।
এই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা জরুরি, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। একই সঙ্গে জাতীয় আয়ের (GDP) কমপক্ষে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—একটি হলো পুরোনো ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে পড়া, আর অন্যটি হলো জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যদি আমরা সত্যিই ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র দেখতে চাই, তবে সেই যাত্রার সূচনা করতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে।
শিক্ষায় বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।