
নিজস্ব প্রতিবেদক
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ২ নং পোগলদিঘা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছুদিন আগেও মাদক বিক্রি অনেকটা গোপনে চললেও বর্তমানে আবারও প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রির প্রবণতা বেড়ে গেছে।
বয়ড়া বাজার, কুরানী পাড়া, আদুর মোড়, একুশে মোড়, তারাকান্দি চৌরাস্তার মোড়, কান্দার পাড়া, রেল ক্রসিং, দামোদরপুর, পশ্চিম পোগলদিঘা এবং যমুনা স্কুলসহ আশপাশের বিশাল এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে নানা অভিযোগ উঠছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাদক যেন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে কিংবা সন্ধ্যার পর বিভিন্ন স্থানে সন্দেহজনক লোকজনের চলাচল এবং মাদক কেনাবেচার অভিযোগে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই এলাকার তরুণ ও কিশোরদের একটি অংশ মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। একটি পরিবারে একজন সদস্য মাদকে জড়িয়ে পড়লে শুধু সেই ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারই আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—মাদক যদি কিছুদিন গোপনে বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে এখন কীভাবে আবার প্রকাশ্যে বিক্রির সাহস পাচ্ছে ব্যবসায়ীরা?
কারা এসব মাদক সরবরাহ করছে? কারা বিক্রি করছে? কোথা থেকে মাদক আসছে? আর কারা নিয়মিত মাদক সেবন করছে—এসব বিষয় খুঁজে বের করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে বয়ড়া বাজার থেকে শুরু করে কুরানী পাড়া, আদুর মোড়, একুশে মোড়, তারাকান্দি চৌরাস্তার মোড় এবং কান্দার পাড়া হয়ে রেল ক্রসিং ও দামোদরপুরের দিকে মাদকবিরোধী নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে পশ্চিম পোগলদিঘা এবং যমুনা স্কুলের আশপাশের পরিবেশ নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে যদি মাদকের বিস্তার ঘটে, তাহলে এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের ওপর।
একজন শিক্ষার্থী যখন মাদকের সংস্পর্শে আসে, তখন তার পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, পারিবারিক সম্পর্ক—সবকিছুই হুমকির মুখে পড়ে। তাই স্কুল-কলেজের আশপাশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান এবং নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তা যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে। প্রয়োজনে মাদক বিক্রির সম্ভাব্য স্পটগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া নেয়।
শুধু অভিযান চালালেই হবে না। মাদকের চাহিদা কমাতেও সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। এলাকার প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও মাদক বিক্রির তথ্য থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে এবং কোনোভাবেই মাদক ব্যবসাকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
পোগলদিঘা ইউনিয়নের মানুষ একটি নিরাপদ পরিবেশ চান। তারা চান, তাদের সন্তানরা মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে থাকুক, বাজার ও জনপদগুলো আবার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসুক।
তাই স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আহ্বান—বয়ড়া বাজার থেকে শুরু করে পোগলদিঘা ইউনিয়নের যেসব এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, সেসব এলাকায় দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর নজরদারি বাড়ানো হোক।
মাদক কোনো ব্যক্তির একার সমস্যা নয়; এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত পুরো প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পারে।
তাই এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।
মাদককে না বলুন, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন—এবং আমাদের সন্তানদের একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসুন।