
নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করে, বিবেকবান করে এবং দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আমাদের সমাজে এমন একটি শ্রেণিও রয়েছে, যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েও জ্ঞান ও দক্ষতাকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না করে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—দেশের সংকট তৈরিতে কি উচ্চশিক্ষিতদের একটি অংশের দায়ও রয়েছে?
প্রথমেই বলা প্রয়োজন, দুর্নীতি বা অপরাধ শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। শিক্ষিত মানুষ মানেই দুর্নীতিবাজ—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি অশিক্ষিত মানুষ দুর্নীতি করে না—এটিও সত্য নয়। তবে উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা যখন অনিয়মে জড়ান, তখন তাদের জ্ঞান, পদমর্যাদা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার কারণে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে।
একজন সাধারণ মানুষ হয়তো ছোট পরিসরে অনিয়ম করতে পারেন। কিন্তু একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, হিসাববিদ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিতে জড়ান, তাহলে তার প্রভাব পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ওপর। কারণ তারা অনেক সময় আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, হিসাবব্যবস্থা ও প্রযুক্তির জটিলতা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। এই জ্ঞান যদি সৎ কাজে ব্যবহার না হয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বিদেশে অর্থ স্থানান্তর, ভুয়া ব্যবসায়িক লেনদেন, অতিমূল্যায়ন-অবমূল্যায়ন, জটিল আর্থিক কাঠামো কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অর্থ সরানোর মতো কর্মকাণ্ড সাধারণত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক জ্ঞান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অপব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই অর্থ পাচারকে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে জড়িত সহযোগী, মধ্যস্থতাকারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোকেও চিহ্নিত করতে হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো—যোগ্যতা যখন নৈতিকতার কাছে পরাজিত হয়। একজন মানুষ যত উচ্চশিক্ষিতই হোন না কেন, যদি তার মধ্যে সততা, দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা সমাজের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপও হতে পারে।
তবে পুরো শিক্ষিত সমাজকে দায়ী করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। আমাদের দেশে অসংখ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, গবেষণা করছেন, উদ্যোক্তা হচ্ছেন, মানুষের সেবা করছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের অবদানও আমাদের স্বীকার করতে হবে।
তাই সমাধান হলো—শুধু শিক্ষার বিস্তার নয়, নৈতিক শিক্ষার বিস্তারও নিশ্চিত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। বড় ধরনের দুর্নীতি কিংবা অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠলে ব্যক্তির পরিচয় বা পদমর্যাদা না দেখে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। দেশের সংকটের দায় কোনো একটি শ্রেণির ওপর চাপিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সংকট তৈরি হয় যখন জ্ঞান, ক্ষমতা ও সুযোগের সঙ্গে নৈতিকতার ভারসাম্য থাকে না। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—শুধু উচ্চশিক্ষিত মানুষ তৈরি করা নয়, সৎ, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করা।
কারণ শিক্ষা যদি বিবেককে জাগ্রত না করে, তাহলে সেই শিক্ষা কেবল যোগ্যতা বাড়াতে পারে; কিন্তু দেশ গড়তে পারে না। আর যে শিক্ষিত মানুষ নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে দেশের সম্পদ।ঐ সকল শিক্ষিত মানুষগুলোকে দে-শ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত।