অনলাইন জুয়ার বিস্তার দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছে অনলাইন জুয়ার রমরমা ব্যবসা। মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের আটক করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ, আটক হওয়ার পর আদালতে চালান দেওয়ার মাত্র তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও পুরোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযান পরিচালনা করেই কি দায়িত্ব শেষ, নাকি অপরাধ নির্মূলে প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ?
অনলাইন জুয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত বিনোদন কিংবা অর্থ উপার্জনের ভুল পথ নয়, এটি সমাজের জন্য একটি বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অল্প সময়ে অধিক টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ, যুবক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই জুয়ার ফাঁদে আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
প্রথমে অল্প কিছু টাকা দিয়ে খেলা শুরু করলেও একপর্যায়ে নেশার মতো আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় বারবার অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এতে কেউ নিজের উপার্জনের টাকা হারাচ্ছেন, কেউ ধারদেনায় জড়িয়ে পড়ছেন, আবার কেউ পরিবারের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করেও এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন জুয়ার কারণে অনেক পরিবারে তৈরি হচ্ছে অশান্তি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, ঋণের বোঝা এবং সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। কোথাও কোথাও জুয়ার টাকা নিয়ে মারামারি, সংঘর্ষসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও সামনে আসছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার পরও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই অপরাধ? যাদের আটক করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানোর পর কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসার ঘটনা ঘটলে অপরাধীরা কতটা ভয় পাবে? অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নতুন করে অন্যরাও এই অপরাধে উৎসাহিত হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, আদালত থেকে জামিন পাওয়া মানেই কেউ অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়। প্রত্যেকেরই আইনি অধিকার রয়েছে। কিন্তু অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং প্রচলিত আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, শুধু নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করে অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা মূল হোতা, অর্থ লেনদেনের মাধ্যম, জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী এবং স্থানীয় এজেন্টদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের অর্থের উৎস ও লেনদেনের পথ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের সচেতন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে এই ভয়াবহ আসক্তির কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
প্রয়োজন হলে প্রচলিত আইন পর্যালোচনা করে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর বিধান নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী ন্যায়সংগত শাস্তি এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে এই অপরাধের বিস্তার রোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন অপরাধের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা। অন্যথায় অনলাইন জুয়ার বিস্তার একসময় নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে চলে যেতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে অনলাইন জুয়ার অন্ধকার জগৎ থেকে রক্ষা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্ব।
আসুন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। নিজের পরিবার, সমাজ ও আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি।