একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের ওপর। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে, দেশ পরিচালনা করবে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু সেই যুবসমাজের একটি অংশ যদি মাদকের ভয়াবহ নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না, ধীরে ধীরে একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়। নষ্ট করে দেয় সামাজিক শান্তি, পারিবারিক বন্ধন এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। মাদকের কারণে অনেক পরিবারে দেখা দেয় অশান্তি, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার এখনই সময়।
প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে মাদকের হাত থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা সম্ভব?
প্রথমত, পরিবার থেকেই সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অবসর সময়ে কী করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে শুধু শাসন নয়, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল সম্পর্কে নিয়মিত আলোচনা, সচেতনতামূলক সভা এবং প্রচার কার্যক্রম চালাতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ, সুস্থ বিনোদন, মানবিক মূল্যবোধ এবং কর্মমুখী পরিবেশ যুবসমাজকে বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে এলাকার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের মাদকবিরোধী কার্যক্রমে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও মাদক বিক্রি বা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। তবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
এবার আসা যাক মাদকবিরোধী আইন ও শাস্তির কার্যকারিতা প্রসঙ্গে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক কারবারে জড়িত কিছু ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পরও জামিনে মুক্ত হয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের পুনরাবৃত্তি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং অপরাধ দমনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তবে মনে রাখতে হবে, আটক হওয়া মানেই কেউ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন নয়। প্রত্যেকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
এক্ষেত্রে মাদকবিরোধী আইনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তের দুর্বলতা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধের পুনরাবৃত্তি এবং মাদক সরবরাহের মূল উৎস শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
শুধু মাদক বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাকে আটক করলেই চলবে না; তদন্তের মাধ্যমে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং এর পেছনে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কার্যকর ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। কারণ, আসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
মনে রাখতে হবে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদকের বিস্তার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সামাজিক আন্দোলন।
তাই আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
আমাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
যুবসমাজ বাঁচলে দেশ বাঁচবে, পরিবার বাঁচবে, সমাজ বাঁচবে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আজই সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি এবং মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুল।