ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাই ও বোনেরা, মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত ও বরকতে আমাদের জীবনে ফিরে আসে পবিত্র শুক্রবার। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় এই দিনটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ ও ফজিলতময়। পবিত্র জুমার দিন শুধু একটি বিশেষ দিন নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, তওবা এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ।
কিন্তু আমরা কি জানি, ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্র শুক্রবার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ইসলামে শুক্রবারকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। এই দিনেই আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। কিয়ামতও জুমার দিনেই সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিস থেকে শুক্রবারের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।
মুসলিম ভাই ও বোনেরা, পবিত্র জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো জুমার নামাজ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-জুমার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, জুমার নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হতে এবং বেচাকেনা পরিত্যাগ করতে।
এই নির্দেশনা আমাদের শিক্ষা দেয়, দুনিয়ার ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগত কাজের চেয়ে মহান আল্লাহর আহ্বানকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য জামাতে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সাম্যের শিক্ষা গ্রহণের বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, উঁচু-নিচু—সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদা করেন। এখানে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া, সততা ও সৎকর্মের মাধ্যমে।
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আমল আমাদের সবার জানা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, জুমার দিন গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং যথাসম্ভব আগে মসজিদে উপস্থিত হওয়া উত্তম আমল। দ্বিতীয়ত, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। তৃতীয়ত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর জিকির করা এবং নিজের ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করা।
বিশেষ করে, সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী এই সুরা তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। সহিহ হাদিসে শুক্রবারে এমন একটি সময়ের কথা বলা হয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। সেই সময়টি কাজে লাগানোর জন্য আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই এই সময়ে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
মুসলিম ভাই ও বোনেরা, শুধু নামাজ আদায় করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আমাদের জীবনে সততা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সহমর্মিতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতে হবে, বাবা-মায়ের প্রতি সদয় হতে হবে এবং মানুষের হক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, কারও প্রতি জুলুম করে, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে কিংবা মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে প্রকৃত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই পবিত্র শুক্রবার হোক নিজেদের ভুল সংশোধন, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং সুন্দর জীবন গড়ার অঙ্গীকারের দিন।
আসুন, এই পবিত্র জুমার দিনে আমরা মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। নিজের পরিবার, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনা করি।
হে মহান আল্লাহ, আপনি আমাদের জানা-অজানা সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আমাদের ঈমান মজবুত করুন, সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। অসুস্থদের সুস্থতা, বিপদগ্রস্তদের মুক্তি এবং অভাবীদের অভাব দূর করে দিন। আমাদের পরিবারে শান্তি, জীবনে বরকত এবং মৃত্যুর আগে খাঁটি তওবা করার তৌফিক দান করুন।
আমাদের সবাইকে পবিত্র জুমার দিনের শিক্ষা অনুসরণ করে সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক জীবন গড়ার তৌফিক দিন।