রকিবুল ইসলাম লিংকন
জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা সার কারখানা (JFCL) বর্তমানে এক গভীর সংকট ও অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি। কারখানার সার্বিক পরিস্থিতি, বিপুল আর্থিক অপচয় এবং বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া নিয়ে সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে তিনটি বড় প্রশ্ন—বন্ধ কারখানায় কোটি কোটি টাকার গ্যাস বিল কেন, পর্যাপ্ত চাপ ছাড়া গ্যাস সরবরাহে বিশাল অপচয় কেন, এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিংয়ের ধকল পোহাতে হয় কেন?
বন্ধ কারখানায় ৬ কোটির গ্যাস বিল:
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানার দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা ১৭০০ মেট্রিক টন। গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ দিন ধরে এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ২৩ মাস কারখানাটির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো—কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ভেতরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর যান্ত্রিক সরঞ্জাম সচল রাখতে বা রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি টাকা করে গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। কারখানা থেকে কোনো আয় না থাকলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
কম প্রেসারে ৩৩ কোটির অপচয়:
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পুনরায় কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। কারখানার পূর্ণমাত্রার উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ৪৬ এমএমসিএফডি (MMCFD) গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ করা হচ্ছিল মাত্র ২৭-২৮ এমএমসিএফডি। স্বল্প বা নিম্ন চাপে (Low Pressure) গ্যাস সরবরাহের কারণে ৬ অক্টোবর কারখানা চালু হলেও মাত্র দুই দিন পর বয়লার লিকেজের অজুহাতে তা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কম প্রেসারে টানা ১৫ দিন গ্যাস সরবরাহের ফলে প্রয়োজনীয় সার উৎপাদিত হয়নি, উল্টো আনুমানিক প্রায় ৩৩ কোটি টাকার বা তারও বেশি মূল্যের গ্যাস অপচয় হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির ক্ষতি সাধিত হয়েছে। অথচ কারখানাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল থাকলে মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা ছিল। তবে এই বিপুল আর্থিক অপচয়ের দায় তিতাস গ্যাস বা কারখানা কর্তৃপক্ষের কেউ নিতে রাজি হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিল দিয়েও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের অভাব:
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কারখানার নিজস্ব সাব-স্টেশন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য নিয়মিত বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও উৎপাদন চলাকালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে কারখানাকে। সরাসরি পৃথক বিদ্যুৎ লাইন থাকা সত্ত্বেও কেন কারখানাটি লোডশেডিংয়ের সুফল বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না—এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
চক্রবদ্ধ অবহেলা ও জনদাবি:
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী ও কারখানার শ্রমিকরা জানান, "প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমরা দেখছি প্রথমে গ্যাসের কম প্রেসার বা লিকেজ, তারপর স্বল্পমেয়াদী উৎপাদন, এরপর ওভারহলিংয়ের নামে বাজেট তৈরি ও রিজার্ভ ফান্ড শেষ করার পর গ্যাস সংকটের অজুহাতে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই অশুভ চক্র যেন থামছেই না।"
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করেন, যমুনা সার কারখানা কোনো 'যাযাবর প্রতিষ্ঠান' নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই প্রশ্নগুলো কারও ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং দেশের সম্পদ ও জনস্বার্থ সুরক্ষার জন্যই উত্থাপিত হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইনের আলোকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অপচয় ও অনিয়মের সুষ্ঠু ব্যাখ্যা এবং জবাবদিহিতা জনগণের সামনে তুলে ধরবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।