নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দামই এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে।
সরকারের যুক্তি—আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বড় ধরনের লোকসান গুনছে এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও রয়েছে।
যুক্তিগুলো অর্থনৈতিকভাবে আলোচনাযোগ্য। কিন্তু জনগণের প্রশ্নও অত্যন্ত স্বাভাবিক—
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশে দাম বাড়ে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বাংলাদেশে কি একইভাবে দাম কমবে?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের ঘোষণায় নয়, ভবিষ্যতের বাস্তব সিদ্ধান্তে দিতে হবে।
কারণ সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা হলো—কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে সেটি কমানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম কমলেও পরিবহন মালিক বলেন, অন্যান্য খরচ বেড়েছে; ব্যবসায়ী বলেন, আগের দামে পণ্য কেনা হয়েছে; আড়তদার বলেন, পরিবহন ব্যয় কমেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও বাজারে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে—সেটিই বড় প্রশ্ন।
জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে যদি পরিবহন ভাড়া বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে জ্বালানির দাম কমার সময় সেই ভাড়া ও পণ্যের দাম কি আবার কমবে?
এখানেই সরকারের নীতির বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।
জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ট্রাকের ভাড়া বাড়ে, বাসের পরিচালন ব্যয় বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং পণ্য বাজারজাতকরণের খরচও বাড়ে।
অর্থাৎ জ্বালানির ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধি বাজারে গিয়ে শুধু ২০ টাকার মধ্যে আটকে থাকে না।
এর প্রভাব পড়ে মানুষের খাবারের টেবিলে।
আজ বাসভাড়া বাড়বে, কাল ট্রাকভাড়া। এরপর পাইকার বলবেন পরিবহন খরচ বেড়েছে, খুচরা বিক্রেতা বলবেন আড়তদার দাম বাড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত চাল, ডাল, সবজি, মাছ, ডিম থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন—
তেলের দাম যখন বাড়ে, তখন বাজারদর বাড়ানোর যুক্তি থাকে; তেলের দাম যখন কমে, তখন সেই বাজারদর কমানোর বাধ্যবাধকতা কোথায়?
সরকারকে এখনই এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশের বাজারে কত সময়ের মধ্যে তার প্রভাব পড়বে—তার একটি পরিষ্কার নীতিমালা থাকা দরকার। জ্বালানির দাম কমার সঙ্গে পরিবহন ভাড়া, কৃষি ব্যয় ও পণ্য পরিবহন ব্যয় কীভাবে পুনর্নির্ধারণ হবে, সেটিও জনগণকে জানাতে হবে।
কারণ জনগণ শুধু দাম বাড়ানোর সূত্র জানতে চায় না; তারা দাম কমানোর সূত্রও জানতে চায়।
বিপিসির লোকসান কমানো প্রয়োজন। জ্বালানি পাচার বন্ধ করাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে দেশের শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে যদি প্রতিবারই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়, তাহলে নীতির অর্থনৈতিক হিসাব আর মানুষের জীবনের হিসাব এক জায়গায় থাকে না।
একজন দিনমজুরের আয় বাড়ে না, কিন্তু বাসভাড়া বাড়ে।
একজন কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে না, কিন্তু সেচের খরচ বাড়ে।
একজন চাকরিজীবীর বেতন বাড়ে না, কিন্তু বাজারের ব্যাগ হালকা হয়ে যায়।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রি বাড়ে না, কিন্তু পণ্য আনার খরচ বেড়ে যায়।
এ বাস্তবতার মধ্যে সরকারকে শুধু জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। বাজার মনিটরিং, পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, কৃষকের সুরক্ষা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যদি মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের স্বস্তির সুফলও জনগণকে দিতে হবে।
দাম বাড়ানোর সময় যদি বিশ্ববাজারের কথা বলা হয়, তাহলে দাম কমানোর সময়ও সেই একই বিশ্ববাজারের হিসাব সামনে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা শুধু চায়—একটি স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত ও দ্বিমুখী মূল্যনীতি।
দাম বাড়লে জনগণ বোঝা বহন করবে, আর দাম কমলে শুধু রাষ্ট্রের হিসাব ভালো হবে—এমন নীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
কারণ রাষ্ট্রের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক শুধু বিপিসির লাভ-লোকসান নয়; মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও তার একটি বড় সূচক।
আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা। কোথায় প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে, কোথায় যৌক্তিক মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন এবং কোথায় সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে—তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে।
জনগণ শুধু জানতে চায় না, আজ তেলের দাম কেন বাড়ল। তারা জানতে চায়—আগামীকাল আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বাংলাদেশের বাজারে তাদের স্বস্তি ফিরবে তো?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
আল আমিন মিলু
লেখক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক | গবেষক
সরিষাবাড়ী, জামালপুর