নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের চলমান পরিস্থিতি অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার হিমসিম খাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি—বেতন বাড়াতে হবে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পে-স্কেল দিতে হবে। অন্যদিকে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাজারের আগুন, বাড়তি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষার খরচ এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছেন।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো কি প্রয়োজনীয়, নাকি এর খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে?
৩১ আগস্ট ২০২৬ সরকার জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। নতুন কাঠামোতে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। নতুন পে-স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের যুক্তি হচ্ছে—মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারী যদি বাজারের বর্তমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারেন, তাহলে তার বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই বাড়তি অর্থ আসবে কোথা থেকে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর অর্থ শুধু মাসিক বেতন বাড়ানো নয়। এর সঙ্গে বাড়তে পারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা সুবিধা, উৎসব ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ব্যয়। ফলে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
আর সরকারের আয় আসে কোথা থেকে?
মূলত জনগণের দেওয়া কর, ভ্যাট, শুল্ক এবং বিভিন্ন সরকারি রাজস্ব থেকে। তাই রাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করে, তার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্যের দাম এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
তবে এটাও সত্য—শুধু পে-স্কেলকে মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বাজারদর বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থা, মুদ্রার বিনিময় হারসহ অনেক বিষয় কাজ করে।
তাহলে ভয়টা কোথায়?
ভয়টা হলো—যদি বেতন বাড়ানোর সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতি না আসে, তাহলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে কিন্তু জনগণ সেই অনুপাতে ভালো সেবা নাও পেতে পারে।
একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ানো মানেই দেশের ক্ষতি—এমন ধারণাও ঠিক নয়। বরং ন্যায্য বেতন একজন কর্মচারীকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারে, দুর্নীতির প্রলোভন কমাতে পারে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে—বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সরকারি সেবার মানও বাড়ছে কি না।
কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যদি সরকারি অফিসে গিয়ে হয়রানির শিকার হন, ঘুষ ছাড়া কাজ না হয়, স্বাস্থ্যসেবায় ভোগান্তি থাকে, শিক্ষা ও প্রশাসনে অনিয়ম চলতে থাকে—তাহলে শুধু বেতন বাড়িয়ে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাজস্ব আয়।
দেশের অর্থনীতি যদি শক্তিশালী হয়, করের আওতা বাড়ে, অপচয় ও দুর্নীতি কমে, অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ হয় এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়—তাহলে নতুন পে-স্কেলের চাপ সামলানো অনেকটাই সহজ হবে।
কিন্তু যদি রাজস্ব আয় দুর্বল থাকে এবং ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে পারে।
আর তখন প্রশ্ন উঠবে—আজকের বেতন বৃদ্ধির মূল্য কি আগামী দিনের মানুষকে দিতে হবে?
তাই ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীকে খুশি করা বনাম ১৮ কোটি মানুষকে বিপাকে ফেলা—বিষয়টি এত সরল নয়।
সরকারি কর্মচারীরাও এই দেশেরই মানুষ। তাদের ন্যায্য জীবনযাপন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একইভাবে ১৮ কোটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সুতরাং নতুন পে-স্কেলের আসল সফলতা নির্ভর করবে শুধু বেতন কত বাড়ল তার ওপর নয়; বরং সরকার কীভাবে এই অতিরিক্ত ব্যয় সামলায় তার ওপর।
আমাদের দাবি হওয়া উচিত—বেতন বাড়ুক, কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতি কমুক। সরকারি সেবার মান বাড়ুক। রাজস্ব আয় বাড়ুক। অপচয় বন্ধ হোক। অর্থ পাচার বন্ধ হোক। উৎপাদন বাড়ুক। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক।
কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন শুধু সরকারি কর্মচারী নয়—কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষ সবাই অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারেন।
শেষ কথা হলো—পে-স্কেল কোনোভাবেই জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত নয়। আবার সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকারও অস্বীকার করা যায় না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে সরকারি কর্মচারীরা সম্মানজনক বেতন পাবেন, আর সাধারণ মানুষও বাজারের চাপে পিষ্ট হবেন না।
কারণ দেশটা শুধু সরকারি কর্মচারীদের নয়—দেশটা আমাদের সবার।
আজকের একটি সিদ্ধান্ত যেন আগামী প্রজন্মের জন্য অর্থনৈতিক সংকটের কারণ না হয়—এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের এবং আমাদের সবার।আসুন নিজের সুখ শান্তির জন্য দেশের সংকট তৈরি না হয় সেই দিকে দৃষ্টি দেই।