নিজস্ব প্রতিবেদক
জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে আওনা ইউনিয়নের কুলপাল খেয়াঘাট থেকে পোগলদিঘা ইউনিয়নের দামোদরপুর ও পশ্চিম পোগলদিঘা এলাকায় ও যমুনা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা ও ৮ নম্বর চর গিরিশ ইউনিয়নের জোরবাড়ী ও রঘুনাথপুর এলাকায় মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে মাদকের কেনাবেচা চলছে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তরুণ ও যুবসমাজ। অনেক পরিবারের সন্তান মাদকের ভয়াবহ ছোবলে জড়িয়ে পড়ছে। একটি পরিবার যেখানে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, সেখানে মাদকের কারণে সেই পরিবারেই নেমে আসছে অশান্তি, হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও মাদক ব্যবসার মূল উৎস পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। ফলে কিছুদিন পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে কথিত মাদক কারবারিরা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান যদি হয়, তাহলে এর সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না কেন? কারা এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে কি না—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যক্তি বা চক্র রাজনৈতিক কিংবা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে তারা প্রশাসনকে ভয়ভীতি বা চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে থাকে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক পরিচয় কারও অপরাধের ঢাল হতে পারে না, আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলেও চিহ্নিত করা যায় না।
আইন সবার জন্য সমান—এটাই একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের মূলনীতি। কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকুক, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি হোক কিংবা সাধারণ নাগরিক—অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মাদক শুধু একটি ব্যক্তির জীবন নষ্ট করে না; এটি ধীরে ধীরে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তরুণরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। চুরি, ছিনতাই, সংঘর্ষসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের পেছনেও মাদকের ভূমিকা থাকতে পারে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবেও দেখতে হবে।
বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিদ্যালয়ের আশপাশ যদি মাদক কারবারিদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
এক্ষেত্রে শুধু পুলিশ প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযোগ নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আওনা, পোগলদিঘা ও চর গিরিশ ইউনিয়নের যেসব এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেসব এলাকায় প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। প্রকৃত মাদক কারবারি কিংবা মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হতে হবে নিয়মিত, দৃশ্যমান এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত। শুধু খুচরা বিক্রেতাকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; মাদকের উৎস, সরবরাহকারী এবং পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, একটি এলাকার মানুষ যখন মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলে, তখন বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সরিষাবাড়ীর এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে চান। তারা চান তাদের সন্তানরা মাদকমুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠুক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে যাতায়াত করুক এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক।
তাই প্রশাসনের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা একটাই—মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করুন। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুন, প্রমাণ পাওয়া গেলে যে-ই জড়িত থাকুক তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিন। দলীয় পরিচয় যেন কোনো অপরাধীর ঢাল না হয়, আবার নিরপরাধ মানুষও যেন হয়রানির শিকার না হন।
কারণ মাদকমুক্ত সরিষাবাড়ী শুধু প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আজ আমরা যদি মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তাহলেই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।আসুন ঐক্য বদ্ধ হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে গণ আন্দোলন গড়ে তুলি মাদক মুক্ত সমাজ গড়ি।