নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি জাতির ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন পুরোনো ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে থাকা আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হয়। সেই সময়ের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে—জাতি ভবিষ্যতের দিকে এগোবে, নাকি অতীতের ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে।
বাংলাদেশও এমন এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলেছি। বলেছি—আইনের শাসন চাই, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা চাই, প্রশাসনের জবাবদিহি চাই, দুর্নীতির অবসান চাই, নাগরিকের ভোটাধিকার চাই, সুশাসন চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব অর্জনের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নতুন বন্দোবস্ত প্রয়োজন, তার সামনে দাঁড়ালে আমরা কি সত্যিই পরিবর্তনের পক্ষেই থাকি?
বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন কথা বলে।
আমরা পরিবর্তন চাই—কিন্তু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে চাই না। নতুন নেতৃত্ব চাই—কিন্তু নতুন নেতৃত্বের ভুলত্রুটি সহ্য করতে চাই না। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই—কিন্তু পুরোনো সুবিধাভোগী কাঠামোর বাইরে যেতে ভয় পাই। ফলে মুখে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও আচরণে আমরা প্রায়ই পুরোনো ব্যবস্থাকেই নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিই।
এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট।
পরিবর্তন মানেই কি অস্থিরতা?
পরিবর্তনকে আমরা প্রায়ই অস্থিরতার সঙ্গে এক করে দেখি। অথচ ইতিহাস বলে, সংস্কারহীন স্থিতিশীলতা অনেক সময় অস্থিরতার চেয়েও ভয়ংকর।
যে রাষ্ট্রে আইন আছে কিন্তু আইনের সমান প্রয়োগ নেই, সেখানে আইন কাগজে থাকে—রাষ্ট্রে নয়।
যে দেশে নির্বাচন আছে কিন্তু নাগরিকের ভোটের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থাকে, সেখানে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকতে পারে—কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাণ থাকে না।
যে প্রশাসনে জবাবদিহির চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন বেশি কার্যকর, সেখানে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় না; শক্তিশালী হয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী।
আর যে বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার পেতে নাগরিককে দীর্ঘ অপেক্ষা, অর্থ ও প্রভাবের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।
অতএব শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
নতুন নেতৃত্বকে কেন আমরা ভয় পাই?
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দুর্বলতা হলো—আমরা ব্যক্তিকে দিয়ে পরিবর্তনের বিচার করি, নীতিকে দিয়ে নয়।
নতুন কেউ সামনে এলে প্রথম প্রশ্ন হয়—“সে কতটা শক্তিশালী?”, “তার পেছনে কারা আছে?”, “সে জিতবে তো?” অথচ হওয়া উচিত ছিল—“তার পরিকল্পনা কী?”, “রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা কী?”, “সে কীভাবে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে?”, “তার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?”
নতুন নেতৃত্ব ভুল করতে পারে। নতুন রাজনৈতিক শক্তি অভিজ্ঞতার অভাবে ব্যর্থও হতে পারে। কিন্তু পুরোনো ব্যর্থতার কারণে নতুন সম্ভাবনাকে চিরকাল অস্বীকার করা কোনো দূরদর্শী জাতির কাজ হতে পারে না।
নতুনকে যাচাই করতে হবে—অন্ধভাবে গ্রহণ নয়, আবার অন্ধভাবে প্রত্যাখ্যানও নয়।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—কেউ স্থায়ী নয়, জনগণই চূড়ান্ত বিচারক।
সংস্কার শুধু আইন বদল নয়
রাষ্ট্র সংস্কার মানে কেবল সংবিধানে কয়েকটি শব্দ পরিবর্তন করা নয়। সংস্কার মানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সাজানো, যাতে ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা;
নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি;
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা;
প্রশাসনে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব কমানো;
দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানের কার্যকর স্বাধীনতা;
সরকারি অর্থব্যয়ের স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা শক্তিশালী করা;
স্থানীয় সরকারকে বাস্তব ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতা দেওয়া;
নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যকর করা;
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সংসদীয় ও নাগরিক জবাবদিহি বাড়ানো।
এসব কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এগুলো রাষ্ট্রের সম্পদ।
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা—রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রংশ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা বারবার একই ভুল করি। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যে দল সংস্কারের কথা বলে, ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে অনেক সময় সেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাই ভুলে যায়।
কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করলে ক্ষমতাসীন ব্যক্তির তাৎক্ষণিক সুবিধা কমতে পারে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন করবে, গণমাধ্যম প্রশ্ন করবে, বিরোধী দল প্রশ্ন করবে, জনগণ প্রশ্ন করবে।
কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশ্ন করাটাই স্বাভাবিক।
রাষ্ট্র এমন জায়গা নয় যেখানে শাসক প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে; বরং রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শাসককেও আইনের কাছে জবাব দিতে হবে।
পরিবর্তনের ভয় কাটাতেই হবে
কোনো সংস্কারই নিখুঁতভাবে শুরু হয় না। নতুন ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা থাকবে, নতুন নেতৃত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে, নতুন প্রতিষ্ঠানের কিছু পরীক্ষামূলক পর্যায় থাকবে।
কিন্তু তাই বলে পরিবর্তনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া যায় না।
আমাদের বুঝতে হবে—পরিবর্তনের বিকল্প হলো পরিবর্তনহীনতা; আর পরিবর্তনহীনতা যদি অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতাকে টিকিয়ে রাখে, তবে সেই স্থিতাবস্থা কোনো নিরাপত্তা নয়।
জাতির সামনে এখন মূল প্রশ্ন—আমরা কি শুধু মুখে পরিবর্তন চাই, নাকি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতেও প্রস্তুত?
আমরা কি নতুনকে তার কর্মসূচি দিয়ে বিচার করব, নাকি তার পরিচয় দিয়ে?
আমরা কি প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে রাখব, নাকি ব্যক্তিকেই প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলব?
আমরা কি ভোটকে শুধু একটি দিনের উৎসব হিসেবে দেখব, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব?
শেষ কথা
একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, পুরোনো ব্যর্থতার বাইরে চিন্তা করতে পারে এবং নতুন সম্ভাবনাকে পরীক্ষার সুযোগ দিতে পারে।
পরিবর্তন মানেই সবকিছু ভেঙে ফেলা নয়; বরং যা ভালো তাকে রক্ষা করে, যা ব্যর্থ তাকে সংশোধন করে এবং যা প্রয়োজন তাকে নতুন করে নির্মাণ করা।
আমরা যদি সত্যিই সুশাসন চাই, তবে শুধু সুশাসনের স্লোগান দিল