নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের আসল কাজ কী—অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া, নাকি থানায় ডেকে বিচার-শালিশ করা?
একটি অভিযোগ থানায় দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুবই স্বাভাবিক—পুলিশ অভিযোগটি গ্রহণ করবে, বিষয়টি আইন অনুযায়ী তদন্ত করবে, সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুলিশ কি থানায় দুই পক্ষকে ডেকে বসিয়ে নিজেরাই বিচার-শালিশ করতে পারে? নাকি পুলিশের মূল দায়িত্ব হলো অভিযোগের তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রতিবেদন ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা?
এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করার পর তাকে এবং অভিযুক্ত পক্ষকে ডেকে নেওয়া হচ্ছে। এরপর শুরু হচ্ছে দীর্ঘ আলোচনা, সমঝোতার চেষ্টা কিংবা সামাজিকভাবে মীমাংসা করার উদ্যোগ। কিন্তু সব ধরনের অভিযোগ কি এভাবে মীমাংসা করা পুলিশের কাজ?
প্রথমেই পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন—পুলিশ রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো অপরাধ প্রতিরোধ করা, অভিযোগ গ্রহণ করা, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও তদন্ত করা, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো অভিযোগে অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলে সেটি কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় যাবে, তা নির্ধারণ করতে হয় প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পুলিশ কোনো পরিস্থিতিতেই দুই পক্ষকে বসিয়ে কথা বলতে পারবে না। পারিবারিক বিরোধ, ছোটখাটো সামাজিক সমস্যা কিংবা এমন কিছু বিরোধ যেখানে আইনসম্মত আপসের সুযোগ রয়েছে—সেখানে বিরোধ কমানোর জন্য আলোচনা বা সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া বাস্তবিক অর্থে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সেই সমঝোতা যেন তদন্তের বিকল্প না হয়ে যায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ পুলিশের কাজ বিচারকের কাজের সঙ্গে এক নয়। আদালত বিচার করবে—অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, কে অপরাধী, কী শাস্তি হবে। পুলিশ তদন্ত করবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে। অর্থাৎ পুলিশ যদি থানাকেই আদালতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তাহলে আইনের স্বাভাবিক কাঠামো প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কেউ অভিযোগ করলেই সে সত্য, আবার কেউ অভিযুক্ত হলেই সে অপরাধী—এমন ধারণাও ঠিক নয়। তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করতে হবে। সাক্ষীর বক্তব্য, নথিপত্র, ঘটনাস্থলের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—দুই পক্ষের প্রতিই পুলিশের আচরণ হতে হবে পেশাদার, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত। থানায় ডেকে এনে ভয় দেখানো, চাপ সৃষ্টি করা, জোর করে আপস করানো কিংবা প্রভাবশালী কোনো পক্ষের কথায় অভিযোগকে ভিন্নভাবে পরিচালনা করা—এসব কোনোভাবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক আইন প্রয়োগের আদর্শ হতে পারে না।
বিশেষ করে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। গুরুতর অপরাধকে শুধুমাত্র ‘সামাজিক সমস্যা’ বলে থানায় বসে মীমাংসা করে দেওয়া হলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কী?
প্রত্যাশা হলো, পুলিশ অভিযোগ শুনবে, আইন অনুযায়ী গ্রহণ করবে, নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি কোনো বিরোধ আপসযোগ্য হলে এবং আইন সেই সুযোগ দিলে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতিতে বিরোধ নিরসনে সহায়তা করতে পারে।
কিন্তু ‘থানায় ডেকে বিচার-শালিশ’ আর ‘আইনসম্মত সমঝোতায় সহায়তা’—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের অর্থ হলো—আইন সবার জন্য সমান। সাধারণ মানুষ যেমন আইনের অধীন, তেমনি প্রভাবশালী ব্যক্তিও আইনের অধীন। তাই থানাকে এমন জায়গা হতে হবে যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক ন্যায়বিচারের আশ্বাস পাবেন, ভয় বা চাপের অনুভূতি নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পুলিশের শক্তি শুধু তাদের হাতে থাকা আইনে নয়; পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই আস্থা তখনই তৈরি হবে, যখন মানুষ বিশ্বাস করবে—অভিযোগ করলে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, প্রভাব নয় বরং প্রমাণ কথা বলবে, এবং কোনো পক্ষকে খুশি করার জন্য আইনকে বাঁকানো হবে না।
সুতরাং পুলিশের আসল দায়িত্ব হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অভিযোগের আইনসম্মত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। আর বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। আইনসম্মত ও আপসযোগ্য বিরোধে সমঝোতায় সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি কখনোই তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, পুলিশ-জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হোক—এটাই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।