নিজস্ব প্রতিবেদক
মাদক একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মাদকের ভয়াবহতা শুধু একজন মাদকসেবীর জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে তার পরিবার, সন্তান, প্রতিবেশী এবং পুরো সমাজের ওপর। তাই মাদক নির্মূল করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেই মাদক ব্যবসা কি কখনো সত্যিকার অর্থে বন্ধ করা সম্ভব?
অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ মাদক কারবারি শুধু মাদক বিক্রি করে না, সে আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রভাব, অর্থ এবং ক্ষমতার বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে। আর যখন কোনো অসাধু ব্যক্তি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে তাকে সহযোগিতা করে, তখন মাদক ব্যবসা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—সব পুলিশ সদস্য বা পুরো পুলিশ প্রশাসনকে একসঙ্গে অভিযুক্ত করা কোনোভাবেই সঠিক নয়। দায়িত্বশীল অসংখ্য পুলিশ সদস্য প্রতিদিন মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছেন, ঝুঁকি নিয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছেন। কিন্তু কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ, মাসোহারা বা মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করার নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একজন মাদক কারবারি যদি টাকা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অসাধু সদস্যকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে সে শুধু মাদক বিক্রির সুযোগই পায় না; বরং তার মধ্যে আইনের প্রতি ভয়ও কমে যায়। তখন সে আরও সাহসী হয়ে ওঠে। নতুন নতুন তরুণ মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ে, পরিবারগুলো ধ্বংস হয় এবং এলাকায় অপরাধের পরিবেশ তৈরি হয়।
মাদক নির্মূল করতে হলে শুধু মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। মাদকের মূল উৎস, সরবরাহকারী, অর্থের যোগানদাতা এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে যারা দায়িত্বে থেকে অপরাধীদের সহযোগিতা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় প্রকাশ্যে বা গোপনে মাদক বিক্রি হলে সাধারণ মানুষকে ভয় না পেয়ে আইনসম্মতভাবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ ও যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা না হয়।
সরকারের দায়িত্ব হলো মাদকবিরোধী অভিযানকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রাখা। কারণ মাদক ব্যবসার সঙ্গে যদি অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক দুর্নীতি যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে একটি অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদক নির্মূল করতে হলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। মানুষ যেন বিশ্বাস করতে পারে—অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তাই প্রশ্নটি আমাদের সবার—মাদক কারবারি যদি প্রশাসনের কোনো অসাধু ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে নিরাপদে ব্যবসা চালানোর সুযোগ পায়, তাহলে মাদকমুক্ত সমাজ কীভাবে তৈরি হবে?
মাদক নির্মূলের জন্য দরকার কঠোর আইন প্রয়োগ, স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। মাদক কারবারির বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি তার পেছনে থাকা যেকোনো সহযোগীকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।
কারণ মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে একটি ভয়ংকর হুমকি। আর এই হুমকি মোকাবিলায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা ও জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে আমাদের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত—অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের প্রধান বিষয়।আসুন মাদক কে না বলি সুন্দর সমাজ ও আগামীর ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ একটি দেশ গড়তে সহায়তা করি।