নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ ২১ আগস্ট—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ভয়ংকর, বেদনাবিধুর ও রক্তাক্ত দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা এবং দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত করে দেওয়া।

সেদিন বিকেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বক্তব্য শেষ করার পর তিনি যখন ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কথা বলছিলেন, তখনই শুরু হয় একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে সমাবেশস্থল পরিণত হয় মৃত্যু ও আতঙ্কের ময়দানে।
গ্রেনেডের বিকট শব্দে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আহত মানুষের আর্তনাদ, রক্তাক্ত শরীর এবং স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ বহু মানুষ নিহত হন এবং শত শত নেতাকর্মী আহত হন। অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। শেখ হাসিনাকেও নিরাপত্তাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে রক্ষা করেন। তাঁর গাড়িতেও হামলার পর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এই হামলা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর এক ভয়াবহ আঘাত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মতের লড়াইয়ে পরাজিত করার পরিবর্তে হত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, ২১ আগস্ট তার নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে।
হামলার পর ঘটনাটির তদন্ত, বিচার এবং দায়ীদের শনাক্ত করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক চলে। পরবর্তী সময়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় হামলার পরিকল্পনা, সহযোগিতা এবং বাস্তবায়নের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে। আদালতের বিভিন্ন রায়ে একাধিক ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা হয়। তবে এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক ছিল।
২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনীতিতে সহিংসতার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। মতের পার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধকে হত্যা, সন্ত্রাস কিংবা প্রতিহিংসায় পরিণত করলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র ও সমাজ।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হতে হবে জনগণের ভোটের মাধ্যমে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা কখনোই গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। বরং ভিন্নমতকে সম্মান করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়াই একটি সুস্থ রাষ্ট্রের ভিত্তি।
২১ আগস্টের সেই ভয়াবহ হামলায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মৃতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে অম্লান হয়ে আছে। আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষগুলোর কষ্টও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতির নামে সহিংসতার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে।
আজ ২১ আগস্টে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই—বাংলাদেশের রাজনীতি হোক শান্তি, গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। কোনো রাজনৈতিক দল বা মতের মানুষ যেন আর কখনো সন্ত্রাস ও হত্যার শিকার না হন।
২১ আগস্ট শুধু একটি তারিখ নয়; এটি আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। ইতিহাসের এই রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু থাকবে না হত্যার রাজনীতি, থাকবে না গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। গণতন্ত্রের মাটিতে মানুষের জীবনই হোক সর্বোচ্চ মূল্য আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের অঙ্গিকার।