নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উদ্দেশ্য কী?—জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং সবার জন্য একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব এমন মানুষের হাতে চলে যায়, যাদের প্রধান পরিচয় ব্যবসায়ী এবং যাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে লাভ-ক্ষতি, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি তখন জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে, নাকি রাষ্ট্রও একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে?
অবশ্যই ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে পারবেন না—এমন কথা বলা যায় না। একজন ব্যবসায়ীও একজন নাগরিক, তারও দেশপ্রেম থাকতে পারে, মানুষের জন্য কাজ করার আন্তরিকতা থাকতে পারে। সমস্যা ব্যক্তির পেশায় নয়, সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বকে ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে এক করে ফেলা হয়।
ব্যবসার মূলনীতি হলো বিনিয়োগ, লাভ এবং বাজার। কিন্তু রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ ও মানবিকতা। ব্যবসায় লোকসান হলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা যায়; কিন্তু রাষ্ট্রে কোনো জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা যায় না। ব্যবসায় যে পণ্য বেশি লাভ দেয়, সেটিই বাজারে বেশি গুরুত্ব পায়; কিন্তু রাষ্ট্রকে লাভের হিসাব না করে দরিদ্র, অসহায়, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে হয়।
ধরা যাক, একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতগুলো যদি শুধুই মুনাফার দৃষ্টিতে পরিচালিত হয়, তাহলে কী হতে পারে? শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, বিদ্যুৎ, পানি কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। কারণ ব্যবসায়িক চিন্তা বলবে—যেখানে বেশি লাভ, সেখানে বেশি বিনিয়োগ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় চিন্তা বলবে—যেখানে মানুষের প্রয়োজন বেশি, সেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও বেশি।
আজ সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো স্বস্তিতে বেঁচে থাকা। একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য চান। একজন শ্রমিক চান তার শ্রমের সঠিক মূল্য। একজন চাকরিপ্রার্থী চান যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ। একজন ব্যবসায়ী চান নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে। একজন মধ্যবিত্ত চান সন্তানদের ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসা দিতে। আর একজন দরিদ্র মানুষ চান অন্তত দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা। রাষ্ট্র যদি এসব মানুষের প্রয়োজনকে কেবল বাজারের হিসাব দিয়ে বিচার করে, তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বাড়তেই থাকবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বার্থের সংঘাত কীভাবে ঠেকানো হবে? একজন ব্যবসায়ী যদি একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতায় থাকেন এবং তার নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থও থাকে, তাহলে জনগণের স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্যে সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে—এই সিদ্ধান্ত কি জনগণের জন্য, নাকি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য?
তবে এর সমাধান ব্যবসায়ীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা নয়। বরং প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর আইন। একজন ব্যবসায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকলেও তাকে অবশ্যই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হবে। নিজের ব্যবসা, পরিবার কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সরকার কোনো ব্যক্তির সম্পদ, পেশা বা পরিচয় দেখে সিদ্ধান্ত নেবে না। সেখানে ধনী-গরিব সবাই আইনের চোখে সমান হবে। রাষ্ট্রের সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সম্পদ নয়; এটি জনগণের সম্পদ। তাই রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।
আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই না, যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারণ হবে তার পকেটের টাকা দিয়ে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন দরিদ্র মানুষও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন। যেখানে চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করতে হবে না, শিক্ষার খরচ জোগাতে সন্তানকে শ্রমে পাঠাতে হবে না, ন্যায্য অধিকার পেতে কারও দরজায় ঘুরতে হবে না।
শেষ কথা হলো—ব্যবসায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন কি না, সেটি একমাত্র প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার পর তিনি কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন? নিজের, নাকি জনগণের?
কারণ রাষ্ট্র কোনো কোম্পানি নয়, জনগণ কোনো ক্রেতা নয় এবং নাগরিকের অধিকার কোনো পণ্য নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যার হাতেই থাকুক, তাকে মনে রাখতে হবে—ক্ষমতা হলো জনগণের আমানত। সেই আমানতের সঠিক ব্যবহারেই নির্ভর করে একটি দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ।
তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই—রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যবসায়ী হোক, কৃষক হোক, শিক্ষক হোক কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ—পরিচয় যাই হোক, নীতি হতে হবে একটাই: জনগণের স্বার্থ সবার আগে।
তবেই রাষ্ট্র হবে মানুষের, ক্ষমতা হবে মানুষের জন্য এবং দেশের মানুষ সত্যিকার অর্থে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার স্বাদ পাবে।