খায়রুল ইসলাম সুইট রাজশাহী থেকে :
শিক্ষা, সংস্কৃতি আর শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য সুপরিচিত রাজশাহী নগরী আজ এক নতুন সামাজিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকটের নাম—কিশোর গ্যাং। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অল্পবয়সী কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী অনেক কিশোর আজ মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অল্প বয়সেই তারা নেশার ভয়াবহ জালে আটকা পড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তুলছে। শুধু তাই নয়, মাদকের প্রভাবে তারা হয়ে উঠছে বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ, নারীদের প্রতি অশালীন মন্তব্য কিংবা আচরণ—এসব যেন তাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহীর ষষ্ঠীতলা, দরগাপাড়া, গুড়িপাড়া, সিরইল কলোনি এবং আসাম কলোনিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। এসব এলাকায় সন্ধ্যার পর অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কেউ কেউ ভয় কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কায় মুখ খুলতেও সাহস পান না। ফলে সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই কিশোরদের একটি অংশ ইতোমধ্যে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের হাতে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এবং নেতিবাচক প্রভাব তাদেরকে অপরাধের দিকে আরও বেশি ঠেলে দিচ্ছে। ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে তারা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, যা সমাজের জন্য এক ভয়ঙ্কর সংকেত।
এক সময় সমাজে ছোটরা বড়দের সম্মান করত, পরিবারের বড়দের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকের সহজলভ্যতা, পারিবারিক অবহেলা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়—সব মিলিয়ে কিশোরদের একটি অংশ আজ পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও পারিবারিক সংকট। পরিবার থেকেই যদি সন্তান সঠিক দিকনির্দেশনা না পায়, তবে সে সহজেই বিপথে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাবা-মা কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানদের প্রতি যথাযথ সময় দিতে পারেন না। ফলে কিশোররা বাইরের নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হয়।
এ অবস্থায় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিশোরদের জন্য ইতিবাচক কার্যক্রম, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত টহল, সন্দেহজনক কার্যকলাপের উপর নজরদারি এবং অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই যেন বিচার ও আইনের ভিত্তি হয়—এটাই এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহীর মতো একটি শান্তিপ্রিয় নগরীতে এই ধরনের পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আজকের এই পথভ্রষ্ট কিশোরদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হলে ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
কারণ, আজকের অবহেলিত কিশোরই আগামী দিনের বড় অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। আবার সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সেই কিশোরই হতে পারে দেশের মূল্যবান সম্পদ। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া জরুরি—সমাজ, পরিবার এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতেই হবে।