নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের কেজি স্কুল বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—কেন এই অনিহা? কেন সরকারি বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা কমছে দিন দিন?
প্রথমত, শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে একটি দীর্ঘদিনের সন্দেহ কাজ করছে। অনেকের ধারণা, সরকারি বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান আগের মতো শক্তিশালী নেই। শিক্ষকরা দক্ষ হলেও নানা প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ক্লাসে নিয়মিত মনোযোগ দেওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত শেখার সুযোগ পায় না। অপরদিকে, কেজি স্কুলগুলোতে নিয়মিত ক্লাস, হোমওয়ার্ক, পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারি থাকায় অভিভাবকরা মনে করেন তাদের সন্তান বেশি মনোযোগ পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশ ও শৃঙ্খলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশের অভাব দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষকরা প্রত্যেকের প্রতি আলাদা নজর দিতে পারেন না। বিপরীতে, কেজি স্কুলগুলোতে ছোট ক্লাস সাইজ, আকর্ষণীয় শ্রেণিকক্ষ, ইউনিফর্ম এবং নিয়মিত কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে।
তৃতীয়ত, ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বাড়তি আগ্রহ একটি বড় কারণ। বর্তমান যুগে ইংরেজিকে একটি প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়। অনেক কেজি স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে বা ইংরেজি-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থাকায় অভিভাবকরা মনে করেন তাদের সন্তান ভবিষ্যতে এগিয়ে থাকবে। সরকারি বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষা থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারে না—এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
চতুর্থত, সামাজিক মানসিকতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। সমাজে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে যে, কেজি স্কুলে পড়া মানেই ভালো শিক্ষা। অনেক অভিভাবক অন্যদের অনুসরণ করে নিজের সন্তানকেও সেই পথে নিয়ে যান। এটি একধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা, যেখানে বাস্তবতার চেয়ে ধারণা বেশি প্রভাব ফেলে।
পঞ্চমত, অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগের ঘাটতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেজি স্কুলগুলোতে নিয়মিত অভিভাবক সভা, ফলাফল মূল্যায়ন এবং সন্তানের অগ্রগতির রিপোর্ট দেওয়া হয়। এতে অভিভাবকরা সন্তানের পড়াশোনা সম্পর্কে আপডেট থাকেন। সরকারি বিদ্যালয়ে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হওয়ায় অভিভাবকরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন।
তবে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার প্রধান ভিত্তি। এখানে অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি এবং নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিদ্যালয় থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসছে এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
তাই শুধুমাত্র কেজি স্কুলের প্রতি ঝোঁক বাড়ানোর পরিবর্তে আমাদের উচিত সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা গেলে এই অনিহা অনেকাংশে কমে আসবে।
সবশেষে বলা যায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে নয়, বরং শিক্ষার প্রকৃত মান ও পরিবেশ বিবেচনা করে অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সরকারি বিদ্যালয়গুলোকে শক্তিশালী করা গেলে একটি সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত জাতি গঠনের পথ আরও সুগম হবে। এই প্রত্যাশা করে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।