নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিমালা প্রণয়ন যেমন জরুরি, তেমনি তার কার্যকর, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন নীতিমালা জনস্বার্থের পরিবর্তে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
টিসিবির ডিলার লাইসেন্স বাতিল বা পুনর্বিন্যাসের মতো সিদ্ধান্ত যদি স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়া নেওয়া হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আবেদন ফি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগও জনমনে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য প্রকাশ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়।
অন্যদিকে, কৃষিখাত আজও নানা সংকটে জর্জরিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে বাজারে সারের সরবরাহ কম, প্রয়োজনীয় আমদানিতে ধীরগতি, দেশীয় কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা এবং অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন মহলে রয়েছে। যদি এসব অভিযোগের সত্যতা থাকে, তবে তা শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ই বাড়ায় না; খাদ্য নিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৃষকের স্বার্থে উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশীয় কারখানার সক্ষমতা কাজে লাগানো, বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অসাধু মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ কঠোরভাবে তদন্ত করা সময়ের দাবি।
একটি কার্যকর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সিদ্ধান্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে অনিশ্চয়তা বাড়ে, বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয় এবং জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, জবাবদিহি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই।
দেশে জ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষের অভাব নেই। কিন্তু তাঁদের পরামর্শ যদি নীতিনির্ধারণে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান জনগণের কোনো উপকারে আসে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও মানুষের অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আজ দেশের মানুষ রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর প্রশাসন, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং দ্রুত জনসেবা প্রত্যাশা করে। রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে যদি জনগণের কল্যাণকে স্থান দেওয়া হয়, তবে উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে নয়, মানুষের জীবনেও প্রতিফলিত হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নীতিমালার বাস্তবসম্মত সংস্কার, কৃষি উপকরণের বাজারে কার্যকর তদারকি এবং সিদ্ধান্তহীনতার অবসানই হতে পারে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ।
— আল আমিন মিলু
লেখক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক | গবেষক
সরিষাবাড়ি জামালপুর