নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভরসা। বাজারে যখন দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন মানুষের প্রথম প্রত্যাশা থাকে—টিসিবি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, টিসিবির কার্যক্রম কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, আর কতটা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যাচ্ছে?
দেশের বিভিন্ন স্থানে টিসিবির ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল, নতুন ডিলার নিয়োগ এবং এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ ও অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও দীর্ঘদিন ধরে ডিলারশিপ ঝুলে আছে, কোথাও আবার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। কারণ টিসিবির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
একজন টিসিবি ডিলার কেবল একজন ব্যবসায়ী নন; তিনি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ের অংশীদার। তাঁর মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষ ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য পান। যদি ডিলার নিয়োগ বা লাইসেন্স ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু ডিলার নন—ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যারা টিসিবির ট্রাকের অপেক্ষায় থাকেন।
অন্যদিকে, সারের লাইসেন্স নবায়ন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং নতুন নীতিমালার কারণে হয়রানির অভিযোগও উদ্বেগের বিষয়। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নীতিমালা অবশ্যই থাকবে, তবে তা যেন জনস্বার্থ রক্ষা করে এবং অযথা ভোগান্তির কারণ না হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্তহীনতা সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি। একটি আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে থাকা, লাইসেন্স নবায়ন আটকে থাকা বা অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া—এসব প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন প্রশাসনিক সেবাও দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয়।
সরকারের উচিত টিসিবির ডিলারশিপ-সংক্রান্ত সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা, প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করা এবং একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ডিলার নিয়োগ ও লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা লাইসেন্স ও নীতিগত জটিলতারও দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
টিসিবি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অঙ্গ। তাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখার উপযোগী। কারণ টিসিবি শক্তিশালী হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, উপকৃত হবে দেশের লাখো সাধারণ মানুষ।
— আল আমিন মিলু
লেখক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক | গবেষক | সরিষাবাড়ী, জামালপুর