নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী রাখার প্রধান দায়িত্ব শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন এবং পরিচালনা পর্ষদের। কিন্তু যখন শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি, প্রভাব-প্রতিপত্তির লড়াই এবং অযোগ্য নেতৃত্ব প্রবেশ করে, তখন শিক্ষার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
বিগত বছরগুলোতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের বিস্তার। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণে যদি যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্ব পায়, তাহলে মেধাবী ও সৎ শিক্ষকেরা পিছিয়ে পড়েন। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে পাঠদানের মান, গবেষণা, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর।
এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে যদি শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতা না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান সঠিক দিকনির্দেশনা হারায়। শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নয়, বরং যোগ্যতা, সততা এবং শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকারের ভিত্তিতে পরিচালনা পর্ষদ গঠন হওয়া উচিত। অন্যথায় শিক্ষকরা অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে পড়েন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
একজন শিক্ষক অবশ্যই একজন নাগরিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত থাকার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে, মূল্যায়নে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণে কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সেই রাজনৈতিক পরিচয় যেন কখনো প্রভাব বিস্তার না করে। শিক্ষকতার সর্বোচ্চ পরিচয় হওয়া উচিত জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতা।
আজ অনেক অভিভাবক প্রশ্ন করেন—কেন শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দোষ দিলেই হবে না। নিয়োগব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদের সক্ষমতা, জবাবদিহিতা, শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুই গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে, পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে যোগ্য ও শিক্ষাবান্ধব ব্যক্তিদের নিয়ে, প্রশাসন থাকবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণই হবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়; এটি জাতি গঠনের পবিত্র অঙ্গন। এই অঙ্গনকে যদি দলীয় প্রভাব, অযোগ্য নেতৃত্ব ও স্বার্থের সংঘাত থেকে মুক্ত রাখা যায়, তবে একটি জ্ঞানভিত্তিক, নৈতিক এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথ অনেক সহজ হয়ে উঠবে।
লেখক কলামিস্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর